মাসখানেক পর একদিন রাতে লগ্ন ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এমন সময়ে আতিকুর রহমানের কলটা এলো। তিনি সরাসরি ফোনে কল দিয়েছে বলে একটু অবাক হলো লগ্ন। সাধারণত অনলাইনেই কথা হয়। লগ্ন কলব্যাক করতেই তিনি বললেন, ‘মা, একটা সাংঘাতিক ঘটনা ঘটেছে।’
‘কী ঘটনা বাবা?’
‘ইফতেখার না মানে ওই নাদভি আহমেদ একটা চিঠি পাঠিয়েছে। সঙ্গে নিয়ে যাওয়া গয়নাগুলো। এমনকি তোর ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে তোলা এক লাখ টাকাও।’
লগ্ন অবাক হয়ে বলল, ‘কী বলছ তুমি?’
আতিকুর রহমান বললেন, ‘হ্যাঁ, চিঠিতে লিখেছে ওর মা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ছিল। তার চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা দরকার ছিল বলে ওই কাজ করেছিল। তবে ওর মাকে বাঁচাতে পারেনি। গয়নাগুলো ফেরত দেওয়ার জন্য নাকি চাকরিতে ঢুকে টাকা জমাচ্ছিল। সব গয়না একদম হুবহু একই ডিজাইনে বানিয়ে পাঠিয়েছে। আমি স্যাঁকড়ার দোকানে গিয়ে সব পরীক্ষা করিয়ে এনেছি। সব আসল। যেটা যতটুকু ওজনের ছিল ঠিক তাই আছে।’
‘তো? মাফ করে দিয়েছ?’
‘মাফ করব কোথা থেকে? ও তো যোগাযোগের কোনো মাধ্যম রাখেনি। একটা লোক এসে এসব দিয়েই চলে গেল।’
‘ধরো যোগাযোগের মাধ্যম পেলে। তখন কি মাফ করবে?’
‘আমার কাছে মাফ চাইলে তো হবে না। মাফ চাইতে হবে তোর কাছে। অন্যায় করেছে তোর সাথে।’
‘থ্যাংক ইউ বাবা। এটুকুই জানতে চাচ্ছিলাম। আমি তাহলে এখন রাখি। শুয়ে পড়েছিলাম। কাল আবার কথা হবে।’
‘আচ্ছা মা।’
পরদিন সকালে লগ্ন ঘুম থেকে উঠেই নাদভিকে দেখা করতে বলল। নাদভি জানে কেন তাকে ডাকা হয়েছে। নিশ্চয়ই বিশ্বাস করবে না। কী আর করা যাবে! সময়টাই তো প্রতিশোধ নিল! জিনিসগুলো ফেরত দেওয়া হয়ে গেলে যদি দেখা হতো!
সকাল ৮টা বাজে। সূর্য উঠতে শুরু করেছে কেবল। এখনো চারপাশ আবছা অন্ধকার। নাদভি বাসার নিচে এসে ফোন করতেই লগ্ন নিচে নামল। বাইরে বরফ পড়ছে। লগ্ন দ্রুত নাদভির গাড়িতে উঠল। নাদভি গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বলল, ‘কোনদিকে যাব?’
লগ্ন চিৎকার করে বলল, ‘জাহান্নামে যাবে।’
নাদভি অফিসের দিকে চালাতে শুরু করল। কাছাকাছি কোথাও গিয়ে নাহয় পার্ক করবে। লগ্ন জানতে চাইল, ‘গয়না টাকাপয়সা ফেরত দিয়ে কি ভাবছো তুমি তোমার সব পাপ মুছে ফেলতে পারবে?’
নাদভি নির্বিকার গলায় বলল, ‘না। কিন্তু যার জন্য এতকিছু করেছি তাকে তো রাখতে পারিনি। ভাগ্যের ফেরে এখন ভালো ইনকাম করছি। এত টাকাপয়সা দিয়ে কী করব? আমার তো কেউ নেই। তাই জিনিসগুলো ফেরত দিচ্ছি।’
লগ্ন ক্ষুব্ধ গলায় বলল, ‘তুমি আসলে আমাকে ইম্প্রেস করার জন্য জিনিসগুলো ফেরত দিয়েছ।’
নাদভি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়িটা পার্ক করল। তারপর লগ্নর দিকে ফিরে বলল, ‘আমি জানতাম তুমি বিশ্বাস করবে না। আফসোসও হচ্ছিল, কেন এসব ফেরত দেওয়ার আগেই আমাদের আবার দেখা হলো!’
লগ্নও এবার নাদভির দিকে ফিরে বসল।
তারপর আগের মতোই ক্ষুব্ধ গলায় জানতে চাইল, ‘তা এত দরদ শুধু আমার জন্যই কেন হচ্ছে? বাকি যে মেয়েগুলোকে ঠকিয়েছ, তাদেরগুলো ফেরত দিচ্ছ না কেন?’
‘সবারগুলোই ফেরত দিচ্ছি লগ্ন। আর একজনেরটা বাকি।’
লগ্ন এবার বিদ্রুপের হাসি দিয়ে বলল, ‘বাহ! আগে থেকেই জানতে যে তোমার একদিন অনেক টাকা হবে আর সবার গয়নাগাটি ফেরত দিতে পারবে তাই সবগুলোর ছবি, মাপ ডিটেইলস রেখেছিলে?’
‘না। বিক্রির জন্যই ছবি তোলা হতো, মাপ লিখে রাখা হতো। সেসব আমার ড্রাইভে রয়ে গিয়েছিল।’
‘বিশ্বাস করি না।’
নাদভি তার ল্যাপটপ থেকে ড্রাইভ খুলে গয়নাগুলোর ছবি, মাপ সেভ করার তারিখ দেখাল। তারপর বলল, ‘আমার বাসায় চলো। গয়নাগুলো বানাতে দেওয়ার রিসিট দেখাই। রিসিটের তারিখ দেখলেই বুঝবে তোমার সাথে দেখা হওয়ার আগে বানাতে দিয়েছি নাকি পরে।’
‘দেখাও।’
নাদভি গাড়ি ঘুরিয়ে তার বাসার দিকে গেল। বাসার সামনে গিয়ে বলল, ‘ভেতরে যাবে নাকি এখানে নিয়ে আসব?’
লগ্নর অনেক কিছু পরখ করার আছে। তাই সে ভেতরে গেল। নাদভি একটা স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টে থাকে। বাসাটা ছবির মতো গোছানো না। আবার ছেলেদের ঘরের মতো এলোমেলো না, নোংরাও না। লগ্ন চেয়ার টেনে বসে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব দেখতে লাগলো। সন্দেহজনক কিছু পেল না অবশ্য। নাদভি সব কাগজপত্র বের করে দেখাল। একেকটা গয়নার রিসিটে একেক তারিখ তবে সবগুলো তারিখই তার সাথে দেখা হবার আগের। এবার কিছুটা শান্ত হলো লগ্ন। নাদভি আবার সব গুছিয়ে রাখল। লগ্ন এবার বলল, ‘ভালো সবার সবকিছু ফিরিয়ে দিচ্ছ। কিন্তু আমার দেনা তো শোধ হয়নি এখনো। আমার সতীত্ব ফিরিয়ে দাও।’
নাদভি চমকে উঠে বলল, ‘কী বলছ? সেদিন তো আমাদের মধ্যে কিছুই হয়নি।’
‘সেটা সারা পৃথিবীর লোক জানে না। সবাই জানে স্বামী এক রাত কাটিয়েই ভেগে গেছে। কেউ কেউ আমাকে কন্ট্রাসেপটিভ পিল এনে দিয়েছে, যদি বাচ্চা হয়ে যায়? আমার সবকিছু আগের মতো করে দাও। আমার হারিয়ে যাওয়া সম্মান ফিরিয়ে দাও। যেন নিজের শহরে নিজের বাড়িতে কারো আহা উহুর শিকার না হয়ে স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারি।’
নাদভি মাথা নিচু করে ফেলল। লগ্নর চোখে জল এসে গেছে। সে বেরিয়ে গিয়ে গাড়িতে বসল।
নাদভি পেছন পেছন এসে গাড়িতে উঠলো। বলল, ‘অফিসের সময় হয়ে আসছে। অফিসের দিকে যাই?’
লগ্ন চোখ মুছে বলল, ‘আমি বাসায় যাব।’
নাদভি লগ্নকে বাসায় নামিয়ে দিলো। লগ্ন অফিসে ফোন করে ইমার্জেন্সি ছুটি নিল। তারপর সারাদিন বিছানায় গড়াগড়ি খেলো। কখনো হাঁসফাঁস লাগল, কখনো চিৎকার করল, কখনো কাঁদল। কী অসহ্য যন্ত্রণা!
নাদভি অবশ্য অফিসে গেল। সারাটাদিন তার অস্থিরতায় কাটল। অফিস শেষ করেই লগ্নর বাসার সামনে গিয়ে ফোন করল। কিন্তু সে ফোন ধরল না। দু-তিনবার ফোন করার পর একটা ই-মেইল পাঠিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। কোনো রিপ্লাই এলো না। রাত বাড়তেই নাদভি বাড়ি ফিরে গেল।
লগ্ন নাদভির ফোন দেখেই ফোনটা সাইলেন্ট করে রেখেছিল। রাতে ফোন হাতে নিতেই দেখল কয়েকবার কলের পর একটা ই-মেইল এসেছে। লগ্ন ই- মেইলটা পড়ল।
লগ্ন,
তোমাকে আমি হুট করেই ভালোবেসে ফেলেছিলাম। কী তীব্র সে ভালোবাসা! তোমাকে বোঝাতে পারব না। আর ভালোবাসার মানুষকে কষ্ট দিয়ে দূরে সরে যাওয়া আরো বেদনাদায়ক। সেই বেদনাও আমার পক্ষে বোঝানো সম্ভব না। সৃষ্টিকর্তা যখন অদ্ভুতভাবে আমাদের আবার দেখা করিয়ে দিলো তখন কেমন যেন একটা আশার আলো জ্বলে উঠল মনে। আমি জানি আমি তোমাকে পাওয়ার যোগ্য নই। তবুও বেহায়ার মতো চাইছি। একটাবার ক্ষমা করে নতুন করে সবকিছু শুরু করার সুযোগ দাও। কথা দিচ্ছি আমার দ্বারা আর কোনো কষ্ট তুমি কখনো পাবে না। আমি তোমাকে একদমই জোর করছি না। সিদ্ধান্ত অবশ্যই তোমার। সিদ্ধান্ত যাই হোক আমি চুপচাপ মেনে নেব, এরপর থেকে তোমাকে আর জ্বালাব না।
-নাদভি
·
·
·
চলবে.........................................................................