রূপালী কবির চিন্তিত মুখে চেয়ারে বসে আছেন।হাতের মধ্যে ধরা ওয়েটপেপারটি অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে ঘুরিয়ে চলেছেন। কৌশিক স্যার বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক দিন ধরে অনুপস্থিত। না কোনো নোট আর না কোনো মেসেজ। পুরো বিষয়টিই তাকে চিন্তায় ফেলেছে। উপরমহলের প্রফেসরদের কাছে প্রতিনিয়ত রিপোর্ট জমা দিতে হয় তাকে। কে অনুপস্থিত, কেনো রেজাল্ট ডাউন, ছাত্রছাত্রীদের পারফর্মেন্স কেনো নিচের দিকে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর তাদেরকে দিতে হয়। কিন্তু ইশতেহার কৌশিক স্যারের মতো কেউ যদি এভাবে হঠাৎ উধাও হয়ে যায়, ফোনেও ধরা না যায়, তবে সেই পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। এসব অহেতুক ভাবনাতেই ডুবে ছিলেন রূপালী যে সবের একটার ও উত্তর তার কাছে ছিল না। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। থামতে না থামতেই হঠাৎ কানে ভেসে এলো বাইরে থেকে আসা চেঁচামেচির শব্দ। তিনি দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে জানালার দিকে এগিয়ে গেলেন। মাঠের দিকে চোখ রাখতেই দেখলেন ছেলেমেয়েরা ছুটোছুটি করছে। সকলের চেহারায় আতঙ্ক। কেউ কাউকে কিছু বলছে না, শুধু দৌড়াচ্ছে আর পিছন ফিরে উপরে তাকাচ্ছে।
রূপালী কবির ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেন না এমন অস্থিরতা কী কারণে। ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা ফোন বেজে উঠলো। টেলিফোন, ফোন! একের পর এক বেজে উঠলো উনার।
বিশ্ববিদ্যালয়টা হঠাৎ করে নিস্তব্ধতা ছেড়ে এক বিশৃঙ্খলার দিকে হাঁটা শুরু করেছে। রূপালী একটা ফোন তুলে কল রিসিভ করলেন। ধ্বক ধ্বক করা বুক নিয়ে বিপরীত পাশের কণ্ঠের জন্য অপেক্ষা করলেন তিনি।
"ম্যাডাম! বাইরে দেখছেন? "
ধীর কণ্ঠে উত্তর দিলেন রূপালী,
"জ্বি দেখেছি। কি হচ্ছে এসব? স্টুডেন্টরা কেনো এভাবে দৌড়াচ্ছে??"
"আমাদের বিল্ডিংয়ের ছাদে একজন দানব এসেছে। দেখতে কি যে ভয়ঙ্কর। যাকে সামনে পাচ্ছে কি যেন করছে সাথে সাথেই সামনের মানুষটি নিস্তেজ হয়ে পড়ে যাচ্ছে। আমি তো ভয়ে বিল্ডিংয়ের ভিতরে ঢুকে বসে আছি।"
ফিসফিসিয়ে বললো লোকটি।
রূপালী চিন্তিত গলায় বললেন,
"ঠিক আছে দেখছি আমি।"
রূপালী দ্রুত ভবন থেকে বেরিয়ে এলেন। বেরোতেই হাতে মুখে ইশারা করতে লাগলেন যাতে শিক্ষার্থীরা ভেতরে ফিরে যায়। তাদের নিরাপদে রাখার দায়িত্ব ই তো সকলের। অন্য শিক্ষকেরাও এই কর্মে ব্যস্ত। শিক্ষার্থীরা নিজেদের বাঁচিয়ে দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করছে। অনেকে প্রবেশ করতে গিয়েও লুটিয়ে পড়ছে সামনে। মাঠজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে কয়েকজনের অবচেতন দেহ। দানবের আক্রমণে জর্জরিত তারা। অ্যাম্বুলেন্স এসে গেছে। সাদা ইউনিফর্ম পরা কর্মীরা দ্রুত কাজ করতে চাইছে। কিন্তু দানবের ভয়ে এগিয়ে আসতে পারছে না যদি তারাও এই দানবের আঘাত পেয়ে বসে তখন? সাংবাদিকরাও ছুটে এসেছে ক্যামেরা হাতে। লাইভ চলছে টিভিতে।
রূপালী আর দেরি না করে নিজেই মাঠে নেমে এলেন। পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করলেন সে। কে এই দানব? কেমন সেই ভিনদেহী প্রাণী? জিজ্ঞাসার ভার বুকে নিয়ে দেখার জন্য মাঠে হাঁটতে লাগলেন রূপালী। বারবার মুখ তুলে দেখার চেষ্টা করতে লাগলেন দানবটিকে চোখের নাগাল পাওয়া যায় কিনা! হঠাৎ উপরের দিকে তাকাতেই চোখ আটকে গেলো তার। দূরে বিল্ডিংয়ের ছাদের দিকে ধোঁয়ায় ঢাকা এক পুরুষাকৃতির অবয়ব দেখা যাচ্ছে। মুখ এবং দেহ সব ঢেকে আছে ঘন কালো ধোঁয়ার চাদরে। তবু মাঝেমধ্যে সেই ধোঁয়ার ফাঁক গলে ঝলসে ওঠে নীল আলো যা মুহূর্তেই শিরা-উপশিরায় ঠান্ডা স্রোতের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
রূপালী স্থির চোখে তাকিয়ে থাকলেন। চেনা চেনা মনে হচ্ছিল তার। এই চোখগুলো সে আগেও দেখেছিল এমন মনে হচ্ছিল। আচমকাই সেই চোখ ঝলসে উঠলো। দূর থেকেই দানবটি তার হাত রূপালীর দিকে ইঙ্গিত করলো এবং সাথে সাথেই শক্তি খেয়ে নিলো। রূপালী কবির বিস্ময়ের সাথে চোখ বড় করলেন আর কিছুক্ষণের মধ্যেই মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।
অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। কৌশিকের দেহ বিল্ডিংয়ের ছাদেই অবস্থান করছে। চোখ চারপাশে ঘুরঘুর করছে। কৌশিক আবারো নিজের উপর থেকে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। সকালে উঠেই নিজেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদে আবিষ্কার করে। তারপর থেকেই সে কি করছে সে নিজেই জানে না। তার শরীরের সমগ্র স্থান থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। তার শরীর শুধু শক্তি চাইছে। প্রচুর শক্তি পেয়েও থামছে না, চাইছে তো চাইছেই।
হঠাৎ নিচে থেকে একজনের কণ্ঠ শোনা গেলো। কৌশিক দ্রুত এগিয়ে এসে নিচে তাকালো। অনন্যাকে দেখা গেলো।
অনন্যা চিৎকার করে বললো,
"কায়েরীথ ! এখানেই থামো। আর কোনো ধ্বংসযজ্ঞ চালিও না।"
কৌশিক হাসলো। হাতের ইশারায় অনন্যা কে আঘাত করতে চাইলো। কিন্তু তার আগেই অনন্যা দৌড়ে বিল্ডিংয়ের ভিতরে ঢুকে গেল। তার ছুটে যাওয়া ছিলো খুব দ্রুত যে কৌশিক বুঝতেই পারলো না কখন মেয়েটা ভেতরে ঢুকে গেল। কৌশিক আবারো পাত্তা না দিয়ে অন্য দিকে মনোযোগ দিলো। অন্য মানুষ খুঁজতে লাগলো। এক হাত দিয়ে মাথা চুলকাতে লাগলো। অন্য হাত বাড়িয়ে সে চোখ ঘুরাতে লাগল। আশেপাশের বিল্ডিংগুলোয় ও মনোযোগ দিলো সে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারপাশটা নিরীক্ষণ করলো। তাকিয়ে থাকতে থাকতে নীল চক্ষুর অন্তরালে সামনের বিল্ডিংয়ে একটা ছেলেকে দৌড়ে যেতে দেখতে পেলো সে। সাথে সাথেই কৌশিক নিজের হাত উঁচু করলো। কিন্তু তার আগেই অনন্যা এসে পড়লো আর প্রিন্স শব্দটা উচ্চারণ করলো। কৌশিকের কর্ণে সেই শব্দ পৌঁছাতেই সে থেমে যায়, স্তব্ধ হয়ে যায়। মুখ ঘুরিয়ে অনন্যার দিকে তাকায়।
কৌশিক অনন্যার মুখ থেকে প্রিন্স শব্দটা শুনে শান্ত হয়ে গেলো। কৌশিকের বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা আচমকাই আওয়াজ করতে লাগলো। তার নীল দৃষ্টি ধীরে ধীরে নিভে যেতে লাগলো। অনন্যাও সেই সুযোগে এগিয়ে এলো। এগিয়ে এসে কৌশিকের গালে হাত রাখলো সে। মায়া ভরা দৃষ্টিতে তাকালো সামনের পুরুষটির দিকে। ধীর কণ্ঠে বললো,
"প্রিন্স! শান্ত হন। কি করছেন আপনি? এমনটা তো আপনি ছিলেন না। তাহলে কেনো এমন করছেন? কেনো মানুষদের শেষ করছেন? আমি জানি আপনি একজন ভালো পুরুষ। অন্তত আমার জন্য তো আপনি একশ গুণ ভালো, প্রিন্স। একবার ভাবুন আপনার এই রূপ দেখে আমার শরীরে কত বড় আঘাত লেগেছে! আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন। কিন্তু জানেন বেঁচে থেকেও আমি মরে যাচ্ছি আপনাকে দেখে?"
কৌশিক নিঃশেষ ক্লান্তিতে ঠান্ডা হয়ে এল। কালো ধোঁয়াগুলো ধীরে ধীরে থেমে গেলেও তার পুরো দেহ এখনো কালো রঙে আচ্ছাদিত। শ্বাস টেনে নিতে নিতে সে নিজের ডান হাতটা ধীরে ধীরে তুললো। আস্তে করে ছুঁয়ে দিল অনন্যার গাল। গলা কাঁপছে এবং চোখ জ্বলছে তীব্রভাবে।
কৌশিক ফিসফিস করে বললো,
"অনন্যা!"
কৌশিকের স্বর কেঁপে উঠলো। মনে হলো সে কান্না করছে,
"আমি এসব করতে চাইনি, প্রিন্সেস। বিশ্বাস করো কিন্তু... "
মাথা নিচু করলো কৌশিক। নিজেকেই লুকাতে চাইলো সেই অন্ধকার থেকে। কিন্তু অনন্যা সেই সুযোগের ব্যবহার করলো। অনন্যার চোখে মায়া জড়িয়ে আছে যেন চোখ দুটোয় বসবাস করছে অনন্যা। কিন্তু ঠোঁটে ম্লান হাসি অর্থাৎ সমস্ত শরীর জুড়ে রয়েছে আরিসার বসবাস। আরিসা অনন্যা কে নিয়ন্ত্রন করে যাচ্ছে আর অনন্যা তাকে আটকাতেও পারছে না।
অনন্যা হাত বাড়িয়ে দিলো সামনে। মুঠো খুলতেই তলোয়ার এসে ধরা দিল হাতে। চোখ বন্ধ করতেই নীল রঙের একটা শক্তির রেশ খেলে গেলো সেই তলোয়ার জুড়ে। অনন্যা মুখে হাসি নিয়ে কৌশিককে আঘাত করার জন্য প্রস্তুত ছিল। সে দুই পা পিছিয়ে তলোয়ার উঠিয়ে কৌশিককে মারার জন্য তৈরিই ছিল কিন্তু মূহুর্তের মধ্যেই ভেনোরা সেই ঈগল পাখির পাখনা দিয়ে উড়ে আসলো বিল্ডিংয়ের ছাদে। তার হাতেও নিজস্ব তলোয়ার ছিল। অনন্যার সাথে তার বড় দ্বন্দ্ব হলো। কৌশিক মূহুর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে অনন্যা কে তলোয়ার ধারণ করতে দেখলো।
ভেনোরার সাথে অনন্যার ভালোই তলোয়ারবাজি হলো। কিন্তু ভেনোরাও যে এতো ভালো লড়াই করতে পারে তা জানতো না কৌশিক। কিন্তু অনেকক্ষণ তলোয়ারে আঘাত হানার পর ভেনোরা ঠিক সামলাতে পারছিলো না। একসময় অনন্যার দ্বারা হাতে আঘাত পেলো ভেনোরা। তার হাতের এক সাইডে বড় চোট দেখা গেলো। সে নিচে বসে পড়ে নিজের হাত চেপে ধরলো। অনন্যা দ্রুত এগিয়ে গিয়ে কৌশিককে মারতে গেলো। কিন্তু কৌশিককে মারার আগেই নিক বিল্ডিংয়ের ছাদে উঠে এলো। বড় কালো পোশাকে তার প্রবেশ ঘটলো। সে খুব দুর্বল ছিল তাও লড়তে আসলো। ভেনোরার তলোয়ার তুলে অনন্যার সাথে লড়াইয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলো নিক। এদিকে কৌশিক নিশ্চুপ হয়ে সমগ্র বিষয় দেখতে লাগলো। অনন্যার এই রূপ সে স্বচক্ষে প্রথমবার দেখলো। অনন্যার মধ্যে যে আরিসা ভর করেছে তাও বুঝতে পারছে কৌশিক। কিন্তু অনন্যার শরীরে যদি কোনো আঁচ লেগে যায়। এই কথা মাথায় আসতেই কৌশিক রেগে গেলো আর দ্রুত পায়ে হেঁটে নিকের পিঠে হাত রেখে থামতে বললো।
নিক ভ্রু কুঁচকে পিছনে তাকালো। কিন্তু অনন্যার পাল্টা ধাওয়া খেয়ে তাকে তলোয়ার চালিয়ে যেতে লাগলো। কৌশিক একসময় চিৎকার করে বললো,
"থামো, নিক। অনন্যা ব্যথা পাবে।"
ভেনোরা নিজের হাত চেপে রেখেই ধমকে উঠলো,
"কৌশিক! তুমি কি পাগল হয়ে গেছো? অনন্যা তোমাকে মেরে ফেলতে চাইছে তাও তুমি ওকে রক্ষা করতে চাও?"
কৌশিক নিজের মাথা চেপে ধরে বললো,
"অনন্যা নিজের মধ্যে নেই। ওর শরীর এখন আরিসা নিয়ন্ত্রণে। তাই ওকে আঘাত করলে অনন্যাও আঘাত পাবে। তাই আমি চাই না...!"
"অনন্যার শরীর অন্য কারো নিয়ন্ত্রণে হোক কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে ও এখন অনেক শক্তিশালী। তোমাকে মারতে এসেছে, কৌশিক।"
অনন্যার আঘাত সামলে উত্তর দিলো নিক।
কৌশিকের চোখে আগুন জ্বলে উঠলো। যন্ত্রণায়, হতাশায় আর একটুখানি বোঝাতে না পারার ক্ষোভে সে আগুনের মতো তেতে উঠলো। কেন কেউ বুঝছে না তাকে? কেন কেউ শুনছে না তার ভেতরের আর্তি? কৌশিকের চোখের মণি আবারো হঠাৎ করে নীল আলোয় ঝলসে উঠলো। শরীর থেকে আবারো কালো ধোঁয়া বের হতে লাগলো! সময় পার হতেই সে ঝাঁপিয়ে পড়লো নিকের উপর। হাত বাড়িয়ে ধাক্কা দিলো নিককে। সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, অতীত সব পিষে গেলো সেই আঘাতে। পরমুহূর্তে কৌশিকের হাতের মুঠো নিকের মাথা চেপে ধরলো আর ধীরে ধীরে তার শক্তি শুষে নিতে লাগলো। নিক অসাড় হয়ে গেলো।
অনন্যার ঠোঁটে ফুটে উঠলো মুচকি হাঁসি। নিক স্তব্ধ হয়ে মুখ তুলে এবং চোখ দুটো বড় করে কৌশিকের দিকে তাকিয়ে রইল। ভালোবাসার কাছে এতটা তুচ্ছ হয়ে গেলো সকল সম্পর্ক? এতটা নির্মম হতে পারলো কৌশিক? অন্যদের প্রতি এতো নিষ্ঠুর হয়ে যাবে শুধুমাত্র নিজের ভালোবাসার মানুষটিকেই মনে রাখবে, তাকে রক্ষা করবে এমনটা কখনো আশা করেনি নিক। হৃদয় ছিন্ন হলো নিকের। কষ্টে ভরে গেলো তার হৃদয়। ভেনোরা চিৎকার করে কৌশিককে থামতে বললো। কিন্তু কৌশিক থামলো না। নিককে শেষ করেই সে থামলো। নিক অসাড় হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। ছটফট করতে লাগলো। ভেনোরার দুই চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। সে ছুটে গেলো নিকের কাছে।
অনন্যা তাচ্ছিল্যের হাসি ছুঁড়ে দিলো কৌশিকের দিকে।। নিজের মাথার চুলে হাত গুঁজে চুলগুলো ঠিক করে নিলো। আরেক হাতে তলোয়ার শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো। এক মুহূর্তও আর অপেক্ষা করল না অনন্যা। তলোয়ার উঁচু করে সোজা এগিয়ে এলো কৌশিকের দিকে। তারপর বিদ্যুৎবেগে তলোয়ার ঢুকিয়ে দিলো কৌশিকের পেটের ভিতর। ঠিক সেই জায়গায় যেখানে কায়েরীথ একদিন আরিসাকে আঘাত করেছিল। বিমূঢ় দৃষ্টিতে কৌশিক অনন্যার চোখে তাকিয়ে রইলো। অনন্যার কাছে সে এমনটাই প্রত্যাশা করেছিল। সে চেয়েছিল তাকে অনন্যাই মেরে ফেলুক। অন্তত এই পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে সুস্থ দেখতে হলে যদি এটাই করতে হয়। তাহলে তাই হোক। কৌশিক হাসলো। কৌশিকের কালো রূপ ধারণ করা শরীরজুড়ে হাসিরা খেল করতে লাগলো। খুব জোরে হাসলো কৌশিক। মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত ছিটকে বেরিয়ে এলো। তীব্র যন্ত্রণায় কাঁপতে কাঁপতে কৌশিক নিচে বসে পড়লো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই ব্যথা কিছুটা সেরে গেলো। কৌশিকের অভ্যন্তরীণ দানব আবারো জাগ্রত হলো। সে দানব নিচে থেকে তলোয়ার তুলে অনন্যা কে আঘাত করার চেষ্টা করলো। অনন্যা কৌশিকের তলোয়ারকে কয়েকবার ঠেকালো। কৌশিক জোরদার আক্রমণ করলো। কিন্তু গুরুর কাছে শিষ্য সবসময় ছোট ই থেকে যায়। কৌশিক ও অনন্যার সাথে পেরে উঠলো না। অনন্যার কয়েকশ আঘাত পেয়ে একসময় কৌশিকের হাত থেকে সেই তলোয়ার পড়ে গেলো ।
অনন্যা সুযোগ বুঝে কৌশিককে ধাক্কা দিয়ে নিচে বসালো। কৌশিক অনেকটা লম্বা ছিল তাই আঘাত করে নিচুতে বসিয়ে সাথে সাথেই আরিসার তলোয়ারটি কৌশিকের বুকের বাম পাশে ঢুকিয়ে দিলো। কৌশিক এই হঠাৎ আক্রমণে তীব্র আর্তনাদ করলো। হাহাকার করতে লাগলো। ব্যথায় চিৎকার করতে করতে সে ভূমিতে লুটিয়ে পড়লো। ধীরে ধীরে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো কৌশিকের দেহ। অনন্যাও হাঁপাতে হাঁপাতে একসময় অজ্ঞান হয়ে নিচে পড়ে গেলো। ঠিক পাশেই ভেনোরা নিশ্চুপ হয়ে বসে ছিল। চোখের সামনে দুই বন্ধুর চলে যাওয়া তার শরীরে কাঁটার মতো লাগলো, ভেতর থেকে চাপা কান্নারা তার গলাকে শক্ত করে চেপে ধরলো। চোখের সামনে সুন্দর পৃথিবীটা ধ্বংস হতে দেখলো সে।ধীরে ধীরে সেও চোখ বুজে ফেললো।
******
হাসপাতালের করিডোরে পা ফেলার জায়গা নেই। অ্যাম্বুলেন্স, নার্স, চিকিৎসক আর আতঙ্কে ভরা স্বজনদের ছুটোছুটি। এই চলছে হসপিটালে। কৌশিকের চলে যাওয়ার পরও তার উপস্থিতি থেকে যাওয়া ধোঁয়ার মতো ছড়িয়ে আছে সবার মনে। নিউজে তার চিত্র ভেসে এসেছে কিন্তু কেউ তাকে ঠিক চিনতে পারেনি। বিশেষত কৌশিকের সেই ভিন্ন রূপের কারণেই ইশতেহার কৌশিক ই যে সেই দানব তা কেউ ধরতে পারেনি। বিষয়টা দুই একজন ছাড়া তেমন কেউ বুঝতে পারেনি। বুঝতে পারার মানুষদের মধ্যে এক ছিল রূপালী। হসপিটালের বেডে সে শুধু শুধু ই পড়ে আছে। একদম সুস্থ স্বাভাবিক একজন মানুষ সে তাও নড়তে চড়তে পারছিলো না শুধুমাত্র কৌশিক স্যারের এই ভিন্ন রূপ ই তাকে শকে পাঠিয়ে দেয় যেখানে থেকে সে বের হতে পারছিলো না।
আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের একে একে ভর্তি করা হয় হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষে। যারা ভূমিতে অসাড়ের পড়েছিল তাদের দেখে প্রথমে মনে হয়েছিল বোধহয় তারা আর ফিরবে না। কিন্তু একদিন পেরোতেই অলৌকিকভাবে প্রত্যেকে ধীরে ধীরে চেতনায় ফিরে আসে। নিককেও নিয়ে আসা হয়েছিল হাসপাতালে। নোহারা নিকের খবর শুনে হাসপাতালে ছুটে এসেছে। নিকের নিথর দেহটা হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে। বারবার ডাকতে ও থাকে, "সন্ধ্যা ব্রো প্লিজ চোখ খোলো। দেখো আমি এখানে আছি। এভাবে তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যেতে পারো না। তুমি তো বলেছিলে আমার সাথে অনেক দিন কাটাতে চাও। তাহলে কেনো?"
কেঁদে উঠলো নোহারা। নিকের শরীরে হাত চাপড়াতে চাপড়াতে ঢুকরে কেঁদে উঠলো সে। ঠিক আধাঘণ্টার মাথায় হঠাৎ নিকের আঙুল নড়ে উঠলো। চোখের পাতা কাঁপলো। তারপর ধীরে ধীরে সে চোখ খুলে নোহারার মারধর সহ্য করলো।
অনেকক্ষণ পরে ফিসফিসিয়ে বললো,
"নো... নোহারা?"
·
·
·
চলবে......................................................................