অদ্ভুতভাবে যেন থমে গেছে সবকিছু। গুলির বিকট শব্দে আশেপাশের পশুপাখির যে উত্তেজিত চলাচল আর আর্তনাদের আওয়াজটা ছিল, তাও মিলিয়ে গেল কোথাও একটা। উচ্ছ্বাস হতভম্ব চোখে তাকিয়ে দেখল মাটিতে উপুড় হয়ে পরে আছে প্রিয়তা। নিথর, বন্ধ চোখজোড়া। ও অস্থির হয়ে রুদ্রকে বলল, 'কী করলি এটা!'
বলতে বলতেই দৌড়ে ছুটে গেল প্রিয়তার কাছে। বেমালুম ভুলে গেল, কিছুক্ষণ আগেই এই মেয়েটা ওকে খুন করতে চাইছিল। ওর কপাল বরাবর বন্দুক ধরেছিল। রুদ্র ঠিকসময় গুলি না চালালে এতক্ষণে মারা পড়তো ও। উচ্ছ্বাস দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে বসল প্রিয়তার পাশে। ডান হাতের আঙুলগুলো দিয়ে আলতো করে প্রিয়তার গাল চাপড়ে দিতে দিতে ডাকল, 'বউমণি! এই বউমণি! বউমণি!'
প্রিয়তা কোন শব্দ করল না। নড়ল অবধি না। উচ্ছ্বাস শুকনো একটা ঢোক গিলল। ভীত, অসহায় চোখে তাকাল রুদ্রর দিকে। তারপর আবার ডাকতে শুরু করল প্রিয়তাকে, 'বউমণি চোখ খোলো! বউমণি!'
রুদ্র এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল নিষ্ঠুর পাষাণের মতো। এবার ধীর কদমে এগিয়ে গেল প্রিয়তার দিকে। এক হাঁটু গেঁড়ে বসল আরেকপাশে। উচ্ছ্বাস ডাকা থামিয়ে আবার তাকাল রুদ্রর দিকে। লম্বা শ্বাস নিতে নিতে বলল, ' মেরে ফেললি?'
রুদ্রর মধ্যে কোন ভাবান্তর নেই। যেন কিছুই ঘটেনি। সব স্বাভাবিক। থমথমে গলায় জবাব দিল, ' না হলে তোকে মে*রে ফেলতো।'
উচ্ছ্বাস ধমকে উঠল একপ্রকার, 'ফেললে ফেলতো! তাই বলে মেরে ফেলবি?'
প্রিয়তার হাতের বাহু ধরে ঘোরালো রুদ্র। শরীরটা উঁচু করে রাখল নিজের হাতের ওপর। মুখের ওপরের ছোট চুলগুলো সরিয়ে দিল আলতো হাতে। তারপর পরীক্ষা করল ঘাড়ের পাশে হাত রেখে। এতোকিছুর মাঝেও কোন অনুভূতির চিহ্ন মাত্র নেই রুদ্রর চেহারায়।
বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল উচ্ছ্বাস। চোখে একপ্রকার জল চলে এসছে। এই সেই রুদ্র যে প্রিয়তার গায়ে সামান্য একটা আঁচর দেখলে পাগল হয়ে যেতো? এইতো বছরখানেক আগেও একবার সিঁড়ি থেকে নামতে গিয়ে হোঁচট খেলো প্রিয়তা। খুবই সামান্য চোট। অথচ তাতেই গোটা আমের ভিলা মাথায় তুলেছিল রুদ্র। যে কী উন্মাদনা! গোটা আমের ভিলা সেদিন অবাক হয়ে দেখেছিল, অন্যকে নৃশংস যন্ত্রণা দেওয়া রুদ্র আমের একটা মেয়ের সামান্য আঘাতে কতটা বিচলিত হতে পারে। অথচ আজ! নিজ হাতে গুলি চালালো রুদ্র! সেই মেয়েটার ওপর! প্রিয়তার ওপর! আর প্রিয়তা! ওরই বা কী রূপ দেখল আজ? কী ব্যবহার দেখল?
চারপাশটা কেমন অন্ধকার ঠেকছে উচ্ছ্বাসের। ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে পায়ের তলার মাটি। কেমন এক ঘোরে চলে যাচ্ছে ও। সবটা ভয়ংকর কোন দুঃস্বপ্ন মনে হচ্ছে। যেন এক্ষুনি ঘুম ভাঙবে আর দেখবে এসব ওর বলদ মস্তিষ্কের উদ্ভট সব ভাবনা। কিন্তু এমন কিছুই হচ্ছে না। সবটাই সত্যি! সবটা!
উচ্ছ্বাস চোখে অবিশ্বাস নিয়ে রুদ্রর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ' হাত কাঁপল না তোর?'
রুদ্র প্রিয়তার মুখটার দিকে তাকিয়ে থেকেই নির্বিকার ভাবে বলল, ' মেরে ফেলেনি। কাঁধের কিছুটা মাংস ছিড়ে বেরিয়ে গেছে বুলেট। মারার জন্যে করলে বুকে গুলি করতাম। তবে এইটুকুতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে সেটা বুঝিনি।'
উচ্ছ্বাস তাকিয়ে দেখল, ক্ষতটা কাঁধের একদম ওপরে। গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে ক্ষতটা দিয়ে। রুদ্র শক্ত করে চেপে ধরল জায়গাটা। আরেক হাতে নিথর শরীরটা চেপে ধরল নিজের সাথে। রক্তাক্ত সেই জায়গাটার দিকে তাকিয়ে থেকেই নরম, স্থির গলায় বলল, 'জীপটা স্টার্ট কর। ফার্স্ট এইড দিতে হবে ওকে।'
•••••••••••
সূর্য তখন সদ্য অস্ত গেছে, কিন্তু তার রক্তিম আভা এখনো পশ্চিম দিগন্তে। এক ঝলক লালচে-কমলা আলো ছড়িয়ে আছে শহরের কংক্রিট দালানের গায়ে। বনানীর ছিমছাম রাস্তাগুলোয় গাড়ির হেডলাইট জ্বলে উঠেছে, সেই আলো ভেসে আসছে ছাঁদ অবধি, মাঝে মাঝে হালকা কুয়াশায় হেডলাইটের রেখা ভেঙে গিয়ে এক ধরনের সুররিয়াল অনুভূতি তৈরি করছে। দূরে ধোয়ার মতো কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে কিছু গাছগাছালি আর উঁচু দালান। পাখির দল ধীরে ধীরে উড়ে যাচ্ছে নীড়ে। কাঁপুনি দেওয়া ঠান্ডা আর অদ্ভুত এক নীরবতা। তারমধ্যেই আজানের শব্দ ভেসে আসছে দূর থেকে। বনানীর সেই বিল্ডিংটার ছাদে পাশাপাশি বসে আছে রুদ্র আর উচ্ছ্বাস। বরাবরের মতোই হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। প্রায় পাঁচমিনিট যাবত চুপ করে আছে এই দুই তরুণ। বসেছে সেই বিকেলে। ধীরে ধীরে সবকিছুই বলেছে রুদ্র উচ্ছ্বাসকে। প্রিয়তার আসল নাম, পরিচয়। আমের ভিলায় প্রবেশের উপায়, উদ্দেশ্য। কী কী অঘটন ঘটিয়েছে, কবে কীভাবে রুদ্রর সামনে সব সত্যিটা এলো। এরপরে কী কী ঘটেছে সব। যদিও একদফায় বলতে পারেনি। বিরতি নিয়েছে কয়েকবার। থেমে থেমে একটা করে সিগারেট টেনেছে, স্থির চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেছে। আবার ধীরেসুস্থে শুরু করেছে। এভাবে বিকেল থেকে সন্ধ্যা অবধি বসে গোটা ব্যপারটা শুনলো উচ্ছ্বাস। শুনতে শুনতে বারবার কেমন ঘোরে চলে যাচ্ছিল ও। মস্তিষ্ক সবটা ধারণ করলেও মন কিছুতেই মানতে চাইছিল না। দুটো বছর দেখেছে প্রিয়তাকে। মেয়েটাকে যে শুধু ছোটবোনের মতো ভালোবেসেছে তা নয়, বরং সেই ভালোবাসা আদায় করে নিয়েছিল প্রিয়তা। যত্ন দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে। সবটাই নাটক ছিল! দু-দুটো বছর এমন নিরন্তর নাটক করে যাওয়া কী আদোও সম্ভব! এই নির্মম সত্যি যেখানে ওর মনেই এতো গভীর আঘাত করছে, এতোবেশি পীড়া দিচ্ছে, ভেতরটাকে ফালাফালা করে দিচ্ছে; সেখানে রুদ্র কীকরে সহ্য করছে? কীভাবে মেনে নিচ্ছে? ওতো মেয়েটাকে ভালোবেসেছিল।
ভাবনাটা মাথায় আসতেই রুদ্রর দিকে তাকাল উচ্ছ্বাস। এরমধ্যেই সাত-আটটা সিগারেট শেষ করে দিয়েছে রুদ্র। উচ্ছ্বাস জানে, সিগারেট পুড়িয়ে আসলে ভেতরের দহনকে আড়াল করতে চাইছে রুদ্র। আর কিছু না। রুদ্রকে কোনভাবে সান্ত্বনা দেওয়া বা কোনকিছু বলার মতো কোন ভাষা জানা নেই উচ্ছ্বাসের। সত্যিটা জেনে যাওয়ার এতোদিন পর ঠিক কী বলে সান্ত্বনা দেওয়া যায়? বরং এইমুহূর্তে ওর একটা সান্ত্বনা প্রয়োজন। মেনে নিতে পারছেনা এই ভয়ংকর সত্যিকে। কিন্তু ভয়ংকর হলেও যে এটাই সত্যি, তাও হারে হারে টের পাচ্ছে বেচারা। দীর্ঘ এক শ্বাস নিয়ে নীরবতা কাটাল উচ্ছ্বাস। মৃদু কন্ঠে বলল, 'বুঝলাম। এজন্যই সেদিন বউমণি মিথ্যে বলে চট্টগ্রাম গিয়েছিল? আলাদাভাবে ফ্ল্যাট নেওয়ার পেছনেও এটাই কারণ?'
মাথা নাড়ল রুদ্র। নাকভর্তি ধোয়া উড়িয়ে দিল বাতাসে। কিছু বলার ভাষা পেলোনা উচ্ছ্বাস। বাচাল, রসবোধ সম্পন্ন ছেলেটাও কেমন থম মেরে গেছে আজকে। অস্থিরভাবে শুধু এদিক ওদিক তাকাল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ বলল, 'আচ্ছা ভাই কোন মিসআন্ডারস্টার্ন্ডিং হচ্ছে নাতো। দুটো বছর কেউ এভাবে অভিনয় করতে যেতে পারে? প্রতিটা সেকেন্ড, প্রতিটা মিনিট? এটা হয়? হয়তো তুই কোনভাবে ভুল বুঝছিস বউমণিকে। হতেই পারে সে কোনকারণে বাধ্য হয়ে করছে সবটা।'
ভ্রু কুঁচকে উচ্ছ্বাসের দিকে তাকাল রুদ্র, 'সিনেমা পেয়েছিস?'
'চ' বর্গীয় ধ্বনী করল উচ্ছ্বাস, 'ধুরো বাল! সিনেমার থেকে কম কী? যা শুনলাম আর দেখলাম! ভয়ংকর কোন থ্রিলার সিনেমাতেও এমন কিছু আছে কিনা জানা নেই আমার।'
রুদ্র কিছু বলল না। রাগে, বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে উচ্ছ্বাস বলল, 'কোন লেভেলের বাইনচোদ হলে কেউ নিজের মেয়েকে এভাবে শত্রুর ঘরে পাঠাতে পারে! শালা ঐদিন তোর আসলেই ভুল হইছে। হাত ধরে রাখার চেষ্টা না করে ধাক্কা দিয়ে ট্রেনের নিচে ফেলে দেওয়া উচিত ছিল মীর্জাকে। ঠিক মতো হইতো।'
রুদ্র তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, ' যে মেয়ে নিজের সন্তানকে খুন করতে পারে, তার বাবার কাছে এটা অসম্ভব কিছু না।'
বিষাদে মুখটা কালো হয়ে গেল উচ্ছ্বাসের। ভাজ পড়ল কপালে। কিছু একটা চিন্তা করতে করতে বলল, 'বিশ্বাস করতে পারছি না ভাই। বউমণি এসব করল? আমার বউমণি! আর যাই হোক, বাচ্চাটাকে বউমণি মেরেছে এটা মানতেই পারছি না আমি। এতোটা নিচে বউমণি নামতে পারে? তুই শিওর, কোথাও ভুল হচ্ছে না? কোথাও কোন ঘাপলা নেই?'
সিগারেটটা ফেলে রেলিং থেকে নেমে গেল রুদ্র, ' থাকলেও এই পরিস্থিতিতে সেটা আর কোন গুরুত্ব রাখেনা। বাকিসব বাদ দিলেও যেটুকুর প্রমাণ আমার হাতে আছে, ওকে নিজের হাতে খুন করার জন্যে সেইটুকুই যথেষ্ট।'
অতঃপর জ্যাকেটটা পড়তে পড়তে বলল, ' দেখে আসি, মীর্জার গুনধর মেয়ের কী অবস্থা। তুই কী থাকবি না যাবি?'
উচ্ছ্বাসও নেমে গিয়ে বলল, ' নাজিফার সাথে দেখা করতে যেতে হবে একবার। কী অবস্থা মেয়েটার কে জানে? এরপর আমের ভিলায়ও যেতে হবে। সবগুলোতো টেনশনে মরছে। কী বলব গিয়ে? বউমণি কাল থেকে ফেরেনি বাসায়। কলের ওপর কল করে যাচ্ছে ওরা।'
' বলবি গুলি লেগেছে ওর। রাইভাল টিমের কেউ অ্যাটাক করেছিল। তাই এখন ওকে বনানীর ফ্ল্যাটে রেখেছি আমি। ফর হার সেইফটি।'
উচ্ছ্বাস চমকে উঠে বলল, ' পাগল তুই? সব এক্ষুনি দৌড়ে চলে আসবে ওকে দেখার জন্যে। ওদের সবার নয়নের মণি বউমণি, সেটা ভুলে যাসনা।'
রুদ্র বিরক্ত হয়ে উচ্ছ্বাসের দিকে তাকিয়ে বলল, ' এই সিম্পল ব্যপারটা ম্যানেজ করতেও শিখিয়ে দিতে হবে আমাকে? গিয়ে বলবি রাতে আর বের হওয়া যাবেনা। চারপাশে শত্রু।রিস্ক আছে। কাল তুই নিজে নিয়ে আসবি। ব্যস্ এইটুকুই।'
' তুই তাহলে আজ সারারাত এখানেই থাকবি?'
' না, বের হতে আমাকে। কাজ আছে। হাতে সময় খুব কম।'
' আমার কোন হেল্প লাগবে?'
' আপাতত না, রঞ্জু থাকবে আমার সাথে। জয়কে এদিকে রেখে যাব।'
উচ্ছ্বাস কিছু একটা ভেবে বলল, ' নাফিজা আর বাড়ির সবার সঙ্গে দেখা করে আমি চলে আসি এখানে। তুই কখন ফিরবি তার ঠিক নেই কোন। বউমণির অসুস্থ। যা শুনলাম সে অনুযায়ী ভীষণ ডেঞ্জারাসও। জয় একা এদিকে কতটা কী সামলাতে পারবে তার ঠিক নেই।'
রুদ্র গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, 'আজ ভোরবেলাতেই খু*ন করতে চেয়েছিল ও তোকে।'
উচ্ছ্বাস মৃদু হাসল, 'তখন সতর্ক ছিলাম না। জানতাম না সত্যিটা। এখন জানি, আর প্রতিরোধও করতে পারব। গোপনে অনেক কাজ করছিস আজকাল, কোন সাহায্য নিচ্ছিস না। হয়তো বিশ্বাস করতে পারছিস না। না পারাটাই স্বাভাবিক। যা ঘটে গেছে তারপর আমি কেন, নিজের ছায়াকে বিশ্বাস করাও তোর পক্ষে কঠিন। আই ক্যান আন্ডারস্টান্ড দ্যাট। কিন্তু এইটুকু হেল্পতো করতেই পারি।'
' ফাইন!' কথাটা বলে ঘড়ি দেখল একবার রুদ্র। তারপর বলল, 'আমি ফ্ল্যাটে গেলাম।'
'রুদ্র!' ছাদের দরজার দিকে পা বাড়াচ্ছিল রুদ্র। উচ্ছ্বাসের ডাকে পেছন ফিরে তাকাল। দু কদম এগিয়ে এসে হঠাৎই জড়িয়ে ধরল উচ্ছ্বাস রুদ্রকে। রুদ্র পাল্টা ধরল না। কিছু বললও না। ঠায় দাঁড়িয়ে রইল সেভাবেই। ওর পিঠে আলতো এক চাপড় দিয়ে ছেড়ে দিল উচ্ছ্বাস। কেন জানি রুদ্র আর দাঁড়াল না। ঠিকভাবে তাকালোও না উচ্ছ্বাসের দিকে। সঙ্গেসঙ্গে উল্টো ঘুরল। দৃঢ় কদমে চলে গেল ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে।
রুদ্র চলে যেতেই রেলিং ধরে দাঁড়াল উচ্ছ্বাস। উদাস চোখে তাকাল আধারে ঘনিয়ে আসা আকাশটার দিকে। এতক্ষণে চেপে রাখলেও ভেতরের বিষাদ এবার প্রকাশ পেল চেহারায়। রুদ্রর সামনে ইচ্ছে করেই স্বাভাবিক ছিল ও। কিন্তু এখন পারছেনা। ভেতর থেকে ঠেলে কান্না বেরিয়ে আসতে চাইছে শুধু। ঠোঁট কামড়ে ধরে নিয়ন্ত্রণ করল নিজেকে। কী থেকে কী হয়ে গেল এসব? সবটা কোন বিভৎস স্বপ্ন কেন হলো না?
••••••••••••
তখন সবে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। রুদ্র নির্দেশ দেওয়া মাত্র দ্রুত গিয়ে জীপটা স্টার্ট করল উচ্ছ্বাস। প্রিয়তাকে কোলে তুলে জিপের পেছনে চলে যায় রুদ্র। প্রিয়তাকে ওখানে রেখে আবার নেমে আসে ও। চারপাশে খুঁজে কিছু ঘাস আর ঔষধি পাতা নিয়ে পুনরায় ফিরে আসে। রুদ্র উঠে বসতেই জীপ স্টার্ট করে উচ্ছ্বাস। রুদ্র দ্রুতহাতে নিজের জ্যাকেট খোলে। তারপর ভেতরে পরা গেঞ্জিটা। সঙ্গে সঙ্গে পৌষের ঠাণ্ডা সজোরে কোপ বসায় শরীরে। কিন্তু সেদিকে পাত্তা না দিয়ে প্রিয়তার জ্যাকেটটাও খুলে ফেলে ও। মেয়েটার পরনে তখন শুধু কালো একটা পাতলা টিশার্ট। হাতের তালু দিয়ে ঘষে ঘাসপাতাগুলো পিষে নেয় রুদ্র। প্রিয়তার কাঁধ থেকে টিশার্টের নামিয়ে তার রস চেপে ধরে ক্ষততে। অর্ধজ্ঞানে থাকা অবস্থাতেই কপাল কুঁচকে ফেলে প্রিয়তা। মৃদু গুঙ্গিয়ে ওঠে। উচ্ছ্বাস বলে, ' হসপিটালে যাবিনা?'
' না। সোজা ঢাকা চল। হাসপাতালে গেলে এখন ঝামেলা হয়ে যাবে। গুলির আঘাত।'
বুঝতে পারল উচ্ছ্বাস। ক্ষতস্থানে রসটা ঠিকঠাক লাগানো পর রুদ্র দ্রুত নিজের টিশার্ট দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলে প্রিয়তার কাঁধের ক্ষতস্থান। তারওপর দিয়েই জ্যাকেটটা জড়িয়ে দিয়ে চেপে ধরে রাখে নিজের সঙ্গে। রুদ্রর পরনে এখন শুধুই একটা স্যান্ডো গেঞ্জি। উচ্ছ্বাস আড়চোখে একবার তাকিয়ে বলে, 'জ্যাকেটটা পরেনে। জমে যাবি।'
রুদ্র নড়েনা, জবাবও দেয় না। স্থির পাথরের মতো বসে থাকে চুপচাপ। একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দেয় উচ্ছ্বাস। যতদ্রুত সম্ভব ঢাকায় পৌঁছতে হবে ওদের। ঢাকায় পৌঁছতে পৌঁছতে দুপুর হয়ে যায়। এরমধ্যে একবার জ্ঞান ফিরেছিল প্রিয়তার। পিটপিটে চোখে কিছুক্ষণ কেবল তাকিয়ে ছিল রুদ্রর দিকে। তারপর আবার চোখ বুজে ফেলে ধীরে ধীরে। গিয়ে রুদ্রর নির্দেশ অনুযায়ী সোজা বনানীর ফ্ল্যাটটাতেই পৌঁছয় ওরা। ততক্ষণে ডাক্তার রতনকে কল করে আসতে বলে দিয়েছে রুদ্র। ওরা পৌঁছনোর কিছুক্ষণ পরেই রতন ডাক্তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে হাজির হন। কোন প্রশ্ন করেননি ডাক্তার রতন। কারণ তার আগেই রুদ্র বলেছিল, 'কিছু জিজ্ঞেস করবেন না কাকা। আপতত কিছু বলার নেই আপনাকে আমার।'
রতন প্রিয়তার ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করে দিয়ে যান। সঙ্গে প্রেসক্রাইব করে যান কিছু ঔষধ। ড্রেসিং করার সময়টাতে জ্ঞান ছিল প্রিয়তার। তবে চোখ খুলে ঠিকভাবে তাকানোর শক্তি পাচ্ছিল না। শুধু তাজা, দগদগে ঘা*য়ে ঔষধ পড়ার সময়টাতে কোঁকাচ্ছিল মৃদু শব্দে। সেই সময়টা উচ্ছ্বাস তাকিয়ে ছিল রুদ্রর দিকে। কেমন শক্ত করে রেখেছিল মুখমন্ডল। যেন মেয়েটার যন্ত্রণায় কিচ্ছু যায় আসেনা ওর। কিন্তু চোখের কাতরতা কী লুকোনো যায়?
ডাক্তার রতনকে বিদায় দিতে আর ঔষধ আনতে নিচে নেমেছিল উচ্ছ্বাস। সব সেড়ে এসে দেখে স্যুপ তৈরী করেছে রুদ্র। ধীরেসুস্থে সময় নিয়ে একবাটি স্যুপ পুরোটাই প্রিয়তাকে খাওয়ানো হয়। প্রিয়তা যেন ঘোরের মাঝে ছিল। অজ্ঞান নয়, কিন্তু পুরোপুরি জ্ঞানেও নেই। ঔষধ খাইয়ে শুইয়ে দেয় ওকে রুদ্র। ঔষধের প্রভাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পরে ও। প্রিয়তা ঘুমিয়ে পড়তেই রুম থেকে বেরিয়ে আসে রুদ্র। বাইরে থেকে লক করে দেয় দরজাটা। ছাদে আসার আগে একবার দেখে এসেছিল রুদ্র। জ্বর উঠেছে প্রিয়তার। সঙ্গেসঙ্গে ডাক্তারকে কল করেছিল রুদ্র। সে জানিয়েছে ব্যপারটা স্বাভাবিক। তবে রাতের মধ্যে মধ্যে যদি না কমে বা আরও বাড়ে, তাহলে জানাতে। ঔষধ লিখে দেবেন উনি। তারপরই দরজা লক করে ছাদে চলে আসে রুদ্র আর উচ্ছ্বাস। এখনো খোলা হয়নি তা। হয়তো এখনো ঘুমোচ্ছে প্রিয়তা ওরফে রাণী মীর্জা।
•••••••••••
আর কেউ না জানলেও উচ্ছ্বাস জানে কী অসম্ভব ভালোবেসেছিল মেয়েটাকে রুদ্র। সেই শুরু থেকে নিজের আসল সত্তা, বিশ্বাস, ব্যক্তিত্বকে ভেঙে মেয়েটার প্রেমে পড়েছিল রুদ্র আমের। ভালোবেসে গেছে। এই দু-বছর ছোট্ট সুন্দর ভুলের মতো আগলে রেখেছে, যত্ন করেছে। সেই ভালোবাসা যে ঠিক কতটা গভীর আর হৃদয়গ্রাসী ছিল তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এতোবড় প্রতারণা আর বিশ্বাসঘাতকতার পরেও প্রিয়তার বেঁচে থাকা। আজ ভোরে বুকের বদলে প্রিয়তার কাঁধে গুলি করা। যেখানে রুদ্র আমেরের আদালতে বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি কেবলই নৃশংস মৃত্যু ছিল, সেখানে তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতারককে সামান্য একটু আঘাতে ভেতরে ভেতরে ছটফট করা, তাকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে ধরে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা অবধি নিয়ে আসাই প্রমাণ করে; ভালোবেসে কী নির্মমভাবে ঠকে গেছে রুদ্র আমের। কীভাবে সহ্য করল ছেলেটা? এতো নির্মম সত্য জেনেও এতোগুলোদিন যাবত কীকরে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে? এতো ধৈর্য্যও ধরতে পারে কেউ? এই কী তবে রাশেদ বাবার সেই প্রশিক্ষণের ফল? কিন্তু উচ্ছ্বাসতো কিছুতেই পারছেনা স্থির থাকতে। ওর সেই শান্তশিষ্ঠ বউমণি। তার কী বিভৎস রূপই না দেখল ও কয়েক ঘন্টা আগে। যে গলার স্বর কখনও উঁচু হয়নি, সেই স্বরে কী বিভৎস হুংকার। যে হাতের চুড়ির ঝুনঝুন আওয়াজ শুনে ও অভ্যস্ত, সেই হাতে আজ বন্দুক ছিল। রুদ্রর মধ্যেই যার প্রাণ ছিল, অস্তিত্ব ছিল। সেই রুদ্রর দিকেই পিস্তল তাক করে ছিল প্রিয়তা! ওকে কী স্নেহ নিয়েই না মিষ্টি স্বরে "ভাই" বলে ডাকতো, মাতৃসুলভ যত্নে আগলে রাখতো। ওর সেই বউমণি ওকে মারতে যাচ্ছিল! রাশেদ বাবাকে প্রিয়তাই খুন করেছে।
বিষয়গুলি গভীরভাবে ভাবলেই বুকের মধ্যে কেমন চাপ অনুভব হচ্ছে উচ্ছ্বাসের। শুধুকী রুদ্র ভালোবেসেছিল? আমের ভিলার প্রতিটা সদস্য মনপ্রাণ উজার করে ভালোবাসা দিয়েছিল মেয়েটাকে। উচ্ছ্বাস নিজেইতো কী ভীষণ শ্রদ্ধা করতো, ভালোবাসতো। একটাদিন মেয়েটা আশেপাশে না থাকলে মনে হতো খুব কাছের কেউ নেই। সেওতো ওদেরকে ভালোবাসে বলেই জানতো উচ্ছ্বাস। অথচ সবটাই কি-না মিথ্যে! নাটক! আটকে রাখা অশ্রুটুকু চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে নামল উচ্ছ্বাসের। এমন আঘাত ছেলেটা বহুদিন পায়নি।
••••••••••
রুদ্র লক খুলে রুমটাতে এসে দেখল প্রিয়তা বেঘোরে পরে আছে বিছানায়। খানিক বাদে বাদে কপালটা কুঁচকে উঠছে শুধু। এইমুহূর্তে টেনটপ পরে আছে ও একটা। ক্ষতস্থানের সোলডার ফিতাটা নামিয়ে রাখা। রুদ্র এগিয়ে গেল প্রিয়তার কাছে। ঝুঁকে কপালে হাত রেখে তাপমাত্রা পরীক্ষা করল। জ্বর বেড়েছে আরও। চাপা শ্বাস ফেলল রুদ্র। ঔষধের বক্স থেকে একটা নাপা ট্যাবলেট খুলে হাতে নিল। পানি গ্লাসটা ফিল করে রাখল পাশে। এরপর বিছানায় বসে মৃদু স্বরে ডাকল, 'প্রিয়তা?'
দ্বিতীয়বার ডাকতে হলোনা। প্রথম ডাকেই পিটপিট করে চোখ খুলল ও। রুদ্র গম্ভীর কন্ঠে হাতের ট্যাবলেটটা দেখিয়ে বলল, 'এটা খেয়ে নাও। জ্বর বাড়ছে।'
প্রিয়তা কিছু বলল না। পিটপিটে চোখে কেবল তাকিয়েই রইল। রুদ্র কাঁধের অক্ষত দিকটা ধরে হালকা উঁচু করল প্রিয়তার শরীরটা। হেলান দিয়ে শোয়ালো হেডরেস্টের সঙ্গে। এরপর খাইয়ে দিল ট্যাবলেটটা। প্রিয়তাও চুপচাপ খেয়ে নিল। কিছু বলল না। রুদ্র ওখানের টুলটা টেনে বসল। নিজের ফোনটা বের করে কল করল কাকে যেন। রিসিভ হতেই বলল, ' হ্যাঁ তাসলিমা। কোথায় তুই?'
তাসলিমাকে চেনে প্রিয়তা। বনানীর এই ফ্ল্যাট পরিষ্কার করে রাখে নিয়মিত। কেউ এলে এখানে আসে কাজ করতে। বিয়ের আগে ও যখন এখানে ছিল, এই মেয়েটাই দেখাশোনা করতো ওর। রুদ্র বলল, ' হ্যাঁ এসেছি ফ্ল্যাটে। তোর ভাবি অসুস্থ। আমাকেও বের হতে হবে। একা থাকবে, দেখাশোনার জন্যে লোক লাগবে। চলে আয়। এক্ষুনি।'
বলে কলটা কেটে দিল রুদ্র। ফোনটা রেখে প্রিয়তার দিকে তাকাতেই দেখল প্রিয়তা ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে দেখছে রুদ্রকে। মুচকি হেসে মেয়েটা বলল, 'এতোবড় একটা সুযোগ হাতছাড়া করে ফেললেন? চাইলেইতো বুকে একটা গু*লি চালিয়ে মুক্ত হতে পারতেন।'
রুদ্র উঠে দাঁড়াল। টি-টেবিলের জিনিসগুলো গোছাতে গোছাতে বলল, ' আপাতত তোমাকে মারার কোন ইচ্ছে নেই আমার।'
' ওখানে ফেলে রেখে আসতে পারতেন। কী হতো? আমার লোকেরা কয়েকঘন্টার মধ্যেই এসে খুঁজে নিয়ে যেতো হয়তো। নয়তো ওখানেই পড়ে থেকে মরতাম। এতো যত্ন করে নিয়ে এসে সেবাযত্নের কী দরকার?'
রুদ্র জবাব দিচ্ছেনা। নিজের কাজ করছে শুধু। প্রিয়তা কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল রুদ্রর দিকে। ক্লান্ত, নরম গলায় বলল, ' আপনি এখনো ভালোবাসেন।'
হাত থেমে গেল রুদ্রর। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল প্রিয়তার দিকে। ঠোঁটে মৃদু ব্যঙ্গাত্মক একটা হাসি ফুটে উঠল ওর। এগিয়ে গেল ওর কাছে। একদম কাছে। প্রিয়তার দুপাশ দিয়ে রেডরেস্টে হাত রেখে বলল, ' এটাকে ভালোবাসা ভাবার কিছু নেই। এতো সহজে মরতে দেব না আমি তোমাকে। এখনো অনেক কষ্ট, যন্ত্রণা সহ্য করা বাকি আছে তোমার। তোমার জীবনটাকে নরকে পরিণত করব আমি।'
প্রিয়তা ক্লিষ্ট হাসল, 'আপনার বুকে নরকও আমার কাছে স্বর্গ।'
ভ্রুকুটি করে ফেলল রুদ্র। তাকিয়ে রইল অসুস্থ, ফ্যাকাশে মুখটার দিকে। প্রিয়তা দুর্বল গলায় বলল, 'একবার প্রিয় বলে ডাকবেন?'
কয়েকসেকেন্ড তাকিয়ে রইল রুদ্র। ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠল ওর চোয়াল। দৃঢ়, থমথমে গলায় রুদ্র জানাল, 'সে অনেক আগেই মরে গেছে।'
বলেই দাঁড়াল সে। একমুহূর্ত দেরী না করে বেরিয়ে গেল ঘরটা থেকে। রুদ্রর যাওয়ার দিকে অপলক তাকিয়ে রইল প্রিয়তা। ক্লান্ত চোখের কোণদুটো চিকচিক করতে অশ্রুতে।
•••••••••••
রুম থেকে বের হয়েই রুদ্র দেখল রঞ্জু আর জয় বসে আছে। দুজনের মখটাই কেমন ফ্যাকাশে। বিষাদ আর চিন্তার ছাপ আছে চেহারায়। রুদ্রকে দেখামাত্র দাঁড়িয়ে গেল দুজন। রুদ্র এগিয়ে গিয়ে বলল, ' আমি বের হচ্ছি। রঞ্জু সাথে চল। আর জয়, তুমি আপাতত এখানেই থাকো। একটু পর তাসলিমা নামের একটা মেয়ে আসবে। রান্নাবান্না, গোছগাছ সব ওই করবে। রাতে উচ্ছ্বাসও আসবে এখানে।'
জয় মাথা নাড়ল কেবল। বেরোনোর উদ্দেশ্যে এগোলো রুদ্র। রঞ্জু পেছন পেছন আসতে আসতে বলল, ' ভাই! ভাবি কেমন আছে? মানে...'
রুদ্র গম্ভীর কথায় বলল, ' ঠিক আছে। ওর চিন্তা বাদ দিয়ে কাজে মন দে।'
মুখ কালো করে মাথা নুইয়ে ফেলল রঞ্জু। মেয়েটার জন্যে চিন্তা হচ্ছে ওর। গুলি ঠিক কতটা ক্ষতি করেছে বুঝতে পারছেনা। কোনদিনও কল্পণাও করেনি রুদ্র ভাই কখনও ওদের ভাবির প্রতি এতো কঠোর হতে পারে। সময় আর সত্যি আসলেই ভীষণ অদ্ভুত। কখন, কীভাবে বদলে যাবে কেউই জানেনা।
••••••••••••
উচ্ছ্বাস বনানীর সেই ফ্ল্যাটে ফিরে এলো রাত দশটায়। এরমাঝে রীতিমতো ঝড় পুহিয়ে এসেছে সে। এখান থেকে বেরিয়েই প্রথমে গিয়েছিল নাজিফাদের বাড়িতে। সেখানে গিয়ে পড়ল বিশাল ঝামেলায়। নাজিফার ভাই-ভাবি কাল সকালেই নাকি চলে যাবে নিজেদের বাড়িতে। তার ভাইয়ের নাকি অফিস আছে, বাচ্চাদের স্কুল আছে। উচ্ছ্বাস নীরবে বসে শুনল সব সমস্যা। তারপর ধীরেসুস্থে জিজ্ঞেস করল, 'তো আপনারা এখন কী চাইছেন?'
এরপর নাজিফার ভাই আর ভাবি মিলে যা বলল তার সারাংশ ছিল নাজিফাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে তারা ইচ্ছুক না। তাদের ছোট ঘরে থাকার সমস্যা, টাকার সমস্যা, সংসারের সমস্যার বিস্তর বর্ণণা এইটাই বোঝায়। যদি নেয়ও সেটা হবে বাধ্য হয়ে। উচ্ছ্বাস ভালোভাবেই বুঝল, এদের সঙ্গে নাজিফাকে পাঠালে মেয়েটা ভালোতো থাকবেই না, বরং মানসিক ট্রমা আরও বেড়ে যাবে। শারীরিক অত্যাচারও যে হবেনা তার কোন গ্যারান্টি নেই। আর এই অবস্থায় এমন রিস্ক নিতে পারবেনা উচ্ছ্বাস। তাই সোজা বলেছিল, 'বেশ! আপনার সত্তোর হাজার টাকার প্রাইভেট জবের সংসারে যখন এতোই অভাব অনটন তখন নাজিফা যাবেনা ভাগ বসাতে। ওকে আমি আমের ভিলায় নিয়ে যাচ্ছি। ঐ ঘরে আবার সাধারণ একজন মানুষের খাওয়াদাওয়া ছয়-সাত হাজারেই হয়ে যায়।'
যদিও নাজিফা যেতে চায়না আমের ভিলায়। সমাজের কটাক্ষ আর বিভিন্ন সংকোচে মানতে চায়নি উচ্ছ্বাসের কথা। কিন্তু উচ্ছ্বাসও নাছোড়বান্দা। প্রায় জোরকরেই নিয়ে এসেছে ওকে আমের ভিলাতে। কথা দিয়েছিল, ডেলিভারিটা হয়ে যাওয়ার পরপরই বিয়ে করবে ওরা।
এইসব ঝামেলা পার করে আমের ভিলায় পৌঁছে সামলাতে হয় আরেক ঝামেলা। প্রথমত নাজিফাকে আমের ভিলায় নিয়ে আসার ব্যপারটা বোঝাতে হয় ওদের সবাইকে। সবাই বুঝলেও দুশ্চিন্তায় অস্থির বাড়ির প্রতিটা সদস্য। প্রিয়তা গতকাল থেকে নিখোঁজ, রুদ্ররও কোন খোঁজ নেই। রুদ্রর ব্যপারটা স্বাভাবিক হলেও দুশ্চিন্তা প্রিয়তাকে নিয়ে। অতঃপর রুদ্রর বলে দেওয়া কথাটাই সবাইকে জানাতে হয়। প্রিয়তার গুলি লেগেছে শত্রুদের হাতে। বনানীর ফ্ল্যাটে নিরাপদে আছে সে এখন। প্রতিক্রিয়াটাও যেমন আশা করেছিল তেমনই আসে। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে সবার। ঐ মুহূর্তে দেখা করার জন্যে ছটফট করে ওঠে। সবাইকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে মানাতে দম প্রায় বেরিয়ে আসে বেচারার। বিশেষ করে কুহুকে! প্রিয় ভাবির আহত হওয়ার খবর পাওয়ামাত্র কেঁদেকেটে চেহারা ফুলিয়ে ফেলেছে মেয়েটা। সেইসব সামলে ওঠা মুখের কথা ছিলোনা। জ্যোতি আর নীরব বুঝদার ছিল বলেই সবটা সামলানো গেছে। তবে জাফর আমের উচ্ছ্বাসকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করেছে, 'কী ব্যপার বলতো? কী হচ্ছে? কিছু ঠিক মনে হচ্ছেনা আমার।'
উচ্ছ্বাস চাপা স্বরে জানিয়েছে, ' বলব কাকা। আপাতত এদিকটা সামলাও। ধীরেসুস্থে বলব সব।'
ফ্ল্যাটে পৌঁছনো মাত্রই গা ছেড়ে দিতে চাইল উচ্ছ্বাসের। ভেতরে এসে দেখল সোফায় দুহাতে মুখ চেপে ধরে বসে আছে জয়। উচ্ছ্বাস ক্লান্তি নিয়ে গিয়ে বসল সোফায়। জয় একবার ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। তারপর পুনরায় মুখ চেপে ধরল। টি-টেবিল থেকে পানি নিয়ে খেল উচ্ছ্বাস। গ্লাসটা শেষ করে জয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটা সম্পর্কেও বলেছে রুদ্র ওকে। বলেছে মীরার সেই করুণ পরিণতির কথাও। ভীষণ মায়া হল উচ্ছ্বাসের জয়কে দেখে। মৃদু গলা ঝেড়ে বলল, ' দেখা করেছিলে ম্যাডামের সাথে?'
জয় মাথা নেড়ে বলল, ' গিয়েছিলাম। কথা বলেননি।'
উচ্ছ্বাস বুঝল মন খারাপ জয়ের। যত যাই করুক। প্রিয়তার প্রতি একটা সফ্ট কর্ণার আছে জয়ের। কোথাও না কোথাও গিয়ে মেয়েটার জন্যে মায়া আছে ওর। তাইতো এতোকিছুর পরেও মেয়েটার জন্যে হওয়া দুশ্চিন্তা লুকোতে পারছেনা জয়। শুধুই কী জয়? উচ্ছ্বাস নিজেও কী পারছে প্রিয়তাকে ঘৃণা করতে? এতো জঘন্য সত্যি জানার পর, মেয়েটার সব ছলচাতুরি ধরা পরে যাওয়ার পরেওতো পারেনি। হ্যাঁ কষ্ট পেয়েছে, ভীষণ কষ্ট পেয়েছে। রাগ হয়েছে। কিন্তু ঘৃণা করতে পারেনি। মেয়েটার জন্যে হওয়া দুশ্চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। দীর্ঘশ্বাস চেপে উচ্ছ্বাস বলল, 'রান্নাঘরে কে?'
' তাসলিমা। আপনাদের এখানেই কাজ করে নাকি?'
মাথা নাড়ল উচ্ছ্বাস। চেনে ও। তারমানে তাসলিমাক ডেকেছে এখানে রুদ্র? কেন? প্রিয়তার শরীর কী বেশি খারাপ? উচ্ছ্বাস ঝট করে উঠে দাঁড়াল। জয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, 'থাকো তুমি। আমি একটু দেখা করে আসছি ওর সাথে।'
জয় কিছু বলল না। মাথা নাড়ল কেবল। উচ্ছ্বাস সামান্য গলা ঝেড়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল রুমের সামনে। দরজাটা ভিড়িয়ে রাখা। উচ্ছ্বাস মৃদু টোকা দিয়ে বলল, 'আসব?'
হেডরেস্টে হেলান দিয়ে শুয়ে ছিল প্রিয়তা। নাপার প্রভাবে তাপমাত্রা আপাতত কম। তবে দুর্বল লাগছে ভীষণ। কাঁধটা যন্ত্রণায় ছিড়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে। গলাটা শুকিয়ে আসছে বারবার। প্রিয়তা একদৃষ্টিতে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে ভাবছিল কিছু একটা। হঠাৎ ডাক শুনে ভাবনায় ছেদ ঘটে। কন্ঠস্বর চিনে নিতে অসুবিধা হয়নি প্রিয়তার। চারপাশে চোখ বুলালো ও। পাশেই রুদ্রর ছাইরঙা একটা শার্ট রাখা। প্রিয়তা শার্টটা টেনে নিল। আস্তেধীরে জড়িয়ে নিল নিজের গায়ের ওপর দিয়ে। তারপর দুর্বল কিন্তু সামান্য উঁচু গলায় বলল, 'এসো।'
উচ্ছ্বাস দরজা ঠেলে ভেতরে এলো। ঢুকেই সরাসরি তাকাল প্রিয়তার দিকে। প্রিয়তা চোখ নামিয়ে ফেলল। উচ্ছ্বাসের চোখে চোখ রাখতে পারল না আজ ও। এখন ওর সত্যিটা জানে উচ্ছ্বাস। নিশ্চয়ই ভীষণ ঘৃণা জন্মেছে ওর প্রতি। জমারই কথা। আজ ভোরেও ছেলেটার মাথা বরাবর বন্দুক ধরেছিল। টানা দুটোবছর এভাবে ঠকিয়েছে। ওদের ভালোবাসার সুযোগ নিয়েছে। ওদের বটবৃক্ষ রাশেদ আমেরকে ওদের জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছে। রাগ, ঘৃণা হওয়াটাই স্বাভাবিক। উচ্ছ্বাস ধীরপায়ে এগিয়ে এসে বসল টুলটা টেনে। কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে রইল প্রিয়তর মুখের দিকে। কী নিষ্পাপ, সুন্দর মুখ। এই মেয়েটা কি-না এতো ভয়ংকর, নিষ্ঠুর! নিজেকে সামলে নিল উচ্ছ্বাস। বলল, 'এখন কেমন আছো, বউমণি?'
প্রিয়তা অবাক হয়ে তাকাল উচ্ছ্বাসের দিকে। এতোকিছুর পরেও এমন নরম স্বরে "বউমণি" ডাক আসা করেনি ও। অবাক কন্ঠেই বলল, 'ভালো।'
উচ্ছ্বাস মৃদু হেসে বলল, ' অবাক হয়ো না। তোমার প্রতি রাগ-ক্ষোভ দুটোই আছে আমার। কিন্তু এমুহূর্তে সেসব প্রকাশ করছি না। বাকিসব কিছুর জন্যে তোমাকে ক্ষমা করে দিতে পারতাম। এমনকি আজ ভোরে আমায় খুন করতে চাওয়ার জন্যেও। কিন্তু রাশেদ বাবার খুনিকে ক্ষমা করা আমার পক্ষে সম্ভব না। কোনভাবেই না।'
প্রিয়তা কিছু বলল না। খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলল, 'বাড়ির সবার কী অবস্থা?'
' সামলে নেওয়া হয়েছে সব।'
' নাজিফা?'
' ঠিক আছে। এখন থেকে আমের ভিলাতেই থাকবে।'
' যাক!'
উচ্ছ্বাস খানিকটা অবাক হয়েই বলল, ' কিন্তু আমাদের পরিবার নিয়ে এতো চিন্তা দেখানোর কী আছে? সত্যিটাতো এখন আমি জানি। নাটকেরতো প্রয়োজন নেই।'
দুর্বল হাসল প্রিয়তা। কথা ঘুরিয়ে বলল, ' রুদ্র কখন আসবে?'
' জানিনা। তাসলিমা একটু পর খাবার দিয়ে যাবে। খেয়ে ঔষধ খেয়ে নিও।'
' তুমি খেয়েছো ভাই?'
উচ্ছ্বাস চোখে বিষাদ নিয়ে তাকাল প্রিয়তার দিকে। কেঁপে যাওয়া কন্ঠে বলল, ' ভাই বলে ডেকোনা বউমণি। এখন এর কোন প্রয়োজন নেই।'
প্রিয়তা নরম গলায় বলল, ' সেতো তুমিও আমায় এখানো বউমণি ডাকছো।'
' আমার ডাকে কোন ছলচাতুরি ছিলোনা বউমণি। ভালোবাসা ছিল। তাই অন্যনামে ডাকতে পারব না।'
' আমারও অভ্যাস হয়ে গেছে ভাই। ছাড়তে পারব না।'
উচ্ছ্বাস তর্ক করল না। কিছুক্ষণ থমকে থাকল সবকিছু। উচ্ছ্বাস বলল, ' তোমার বাইকটা জয় নিয়ে এসেছে। নিচে গ্যারেজে আছে। সেটার চাবি, তোমার বেরেটা আর ফোনটা রুদ্রর কাছে আছে।'
প্রিয়তা কিছু বলল না। হঠাৎই উচ্ছ্বাস বলে বসল, ' কেন এমন করলে বউমণি? এতোগুলো মানুষের বিশ্বাসে আঘাত করার আগে বুক কাঁপলোনা তোমার? আমরা সবাই তোমাকে খুব ভালোবাসতাম জানো। রুদ্ররতো প্রাণ ছিলে তুমি। দেখ, সব সত্যি জানার পরেও আমরা কেউ পারছি না তোমাকে ঘৃণা করতে। জয়, রঞ্জু, আমি। কেউই পারছি না। অথচ আমাদের সবাইকেই তুমি এতো নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করলে? কেন?'
কথাটা বলতে বলতেই দুচোখ দিয়ে টপটপ কর দুফোটা জল গড়িয়ে পড়ল উচ্ছ্বাসের। চমকে উঠল প্রিয়তা। ছেলেটাকে প্রিয়তা হাসতেই দেখেছে বেশিরভাগ সময়। ভীষণ দুঃখ নিয়েও ও হেসেছে। সহজে কাঁদেনা ও। প্রিয়তা বিস্ময় কাটানোর আগেই উচ্ছ্বাস বলল, ' একটা কথা জিজ্ঞেস করব বউমণি?'
প্রিয়তা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল। উচ্ছ্বাস শুকনো এক ঢোক গিলে বলল, ' তুমি কী আজ সত্যিই আমার ওপর গু*লি চালাতে বউমণি?'
প্রিয়তা জবাব দিলো না। শুধু অপলক তাকিয়ে রইল উচ্ছ্বাসের দিকে। কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করল উচ্ছ্বাস। কিন্তু কোন জবাব এলোনা। তাই দীর্ঘশ্বাস চেপে, 'ছাড়ো! খাবার খেয়ে ঔষধ খেয়ে নিও।'
বলে উঠে দাঁড়াল উচ্ছ্বাস। চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। অনেকক্ষণ টানা সেদিকে তাকিয়ে রইল প্রিয়তা। অতঃপর হেলান দিল হেডরেস্টে। চোখজোড়া বন্ধ করে আপনমনেই বলল, 'তোমরা কেউ পিস্তলটা চেইক করে দেখোনি ভাই। করলে জানতে, ওটা আজ খালি ছিল।'
বাক্যটা শেষ করতেই চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে নামল দুফোটা জল।
••••••••••
চট্টগ্রামে করিম তাজওয়ারের অফিসরুমটাতে থম মেরে বসে আছে শওকত মীর্জা আর করিম তাজওয়ার। কপালে রেখাগুলো গভীর হয়ে ফুটে আছে। মুখের অবস্থা খুবই করুণ। যেন একদিনেই বয়স একধাক্কায় বেড়ে গেছে দশটা বছর। দুজনের একজনও কিছু বলছেনা। ঘরটাতে পিনপতন নীরবতা বেশ অনেকক্ষণ যাবত। দরজা খোলার আওয়াজে ধ্যান ভাঙে দুজনের। ধীর পায়ে বেরিয়ে ভেতরে এলো শান মীর্জা। চোখেমুখে ভীষণ ক্লান্তি আর হতাশা। ও একটা চেয়ার টেনে বসতেই শওকত প্রশ্ন করল, ' রাণীর খোঁজ পাওয়া যায়নি?'
না বোধক মাথা নাড়র শান। হতাশ হলেন শওকত। মাথা চেপে ধরল করিম। শান গ্লাসে পানি ঢেলে এক ঢোকে শেষ করল সবটা। লম্বা একটা শ্বাস ফেলে বলল, ' মালগুলোর কোন খোঁজ পেয়েছো?'
করিম পানসে মুখে বলল, ' আর মাল! এ আর পাওয়া যায়। শালা তোমাদের আগেই বলেছিলাম ঐসব প্লানবি-ফি এর চক্করে পড়ো না। এতোকাল বেঁচেছিলাম আমেরদের ঐ "আ'ল নট হার্ম দেম আনটিল দে হার্ম আস" রুলসের কারণে। প্লান বি এক্সিকিউট করে সেই রুলসের রফাদফা করে দেওয়া হয়েছে। এইবার মালগুলো ঠিকঠাক না দিতে পারলে সব শেষ। এরপর আর কী? সবগুলোকে কুত্তার মতো দৌড় করিয়ে মারবে রুদ্র। তৈরী হও।'
শান বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে বলল, 'চুপ করবেন একটু? আপনার এসব বকবক সহ্য হচ্ছে না এই মুহূর্তে। যথেষ্ট টেনশনে আছি। এমনিতেই পাগল পাগল লাগছে। আপনি আর নতুন করে পাগল করবেন না। তারওপর রাণীও নিখোঁজ।'
শওকত মীর্জা শক্ত হয়ে বসে আছে। ভেতরে ভেতরে অগ্নিকুন্ড জ্বলছে একপ্রকার। রাগে হাত-পা কাঁপছে তার। ভেতরেই সেই সাইকোপ্যথ জেগে উঠছে। ইচ্ছে করছে সামনে যেকটা আছে সবগুলিকে কুপিয়ে মারতে।
সবগুলোকে খানিকটা চমকে দিয়ে 'ধরাম' করে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো সম্রাট। রাগে গজগজ করতে করতে হনহনে পায়ে এলো সে। সজোরে লাথি বসালো একটা চেয়ারে। চেয়ারটা উল্টে পড়ল। করিম ভ্রুকুটি করে বলল, ' কী হয়েছে কী?'
হুংকার দিয়ে উঠল সম্রাট, ' বাল হইছে আমার। বাল...'
' সম্রাট!'
' চুপ করো!'
বলতে বলতে আরেকটা চেয়ার ধরে আছাড় মারল ও। এবার উঠে দাঁড়াল শান। সম্রাটের বাহু ধরে টেনে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল, ' আবাল গিরি না করে চুপচাপ বসো। এখন এসব করে লাভ নেই, উল্টে ক্ষতি। চুপচাপ বসো। পানি খাও।'
ধরে বসালো হলো সম্রাটকে। টানা দু গ্লাস পানি খেয়ে একটু ঠান্ডা হলো সম্রাট। এতক্ষণে মুখ খুলল শওকত মীর্জা, 'রাণীর খোঁজ পাওনি তাইতো?'
আবার হুংকার দিয়ে উঠল সম্রাট। ঝাঁজল কন্ঠে বলল, 'ঐ বাইনচোদ, মাদারচোদ রুদ্রই কিছু একটু করেছে ওর সাথে। আমি ড্যাম শিওর। সোর্স বলছে ঐ বেজন্মা উচ্ছ্বাসটাকেও নাকি কালকে দেখছে চট্টগ্রাম। ওরে যে কমে পিষষা মারমু আমি। ট্রাস্ট মি! রাণীর গায়ে যদি একটু আঁচর লাগে। ঐ রুদ্র আমেরকে আমি ফালাফালা করে ফেলব, আই স্যয়ার।'
করিম তাজওয়ার ধমক দিয়ে বলল, 'থামাও তোমার আশিক টাইপ হুমকিধামকি। সেসবের সময় নেই এখন।' তারপর শওকতের দিকে তাকিয়ে বলল, 'কালকের ডেলিভারির ঐ কোডটা কারো জানার কথা না কিন্তু মীর্জা। তোমার মেয়ে কোনভাবে সাহায্য করছেনাতো রুদ্রকে? স্বামীর প্রতি প্রেম উতলে উঠছে নাতো?'
ক্ষেপে গেল শান! কিছু বলতেই যাচ্ছিল তার আগেই হাতের ইশারায় থামিয়ে দিলেন শওকত। গম্ভীর গলায় বলল, 'সবার আগে ও-ই সাবধান করেছিল আমায় করিম।'
সম্রাটও একমত হয়ে বলল, ' আর সেই মালগুলো উদ্ধার করতে গিয়েই ও এখন বিপদে। ফালতু বকোনা বাবা।'
কিন্তু একমত হতে পারল না করিম। বিশ্বাসও করতে পারল না। কিন্তু এ বিষয়ে না ঘেঁটে বলল, ' কিন্তু এখন কী করবে সেটা ভেবে দেখেছো? আগেরবারতো হুসাইনের থেকে মাল অ্যারেঞ্জ করে ক্লাইন্টদের দেওয়া গেছে। কিন্তু এবার? এবার ক্লাইন্টদের মাল কোথাথেকে দেব? সময়ও বেশি নেই। কীভাবে করব সব? এমনিতেই বিদেশি গ্রুপগুলো অলরেডি সন্দেহের চোখে দেখছে। এবার ক্লাইন্টরা মাল না পেলে ওদিক থেকেতো চাপ আসবেই। তারওপর বিদেশী দলগুলো ভবিষ্যতে আর কোন ডিলতো দেবেইনা আমাদের। যেগুলো চলছে তাও ক্যান্সেল করে দেবে।'
শান বলল, ' তাও ভালো আগেরবার হুসাইন আলীর থেকে মালগুলো নিয়ে ক্লাইন্টদের দেওয়া গেছে। না হলে এতক্ষণে নিশ্চিত হয়ে যেতাম উই আর ফিনিশড। কিন্তু এখন হুসাইন আলীর টাকাই বা কী ভাবে শোধ করব?'
কেউ কিছু বলবে তার আগেই হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে এলো পলাশ মীর্জা। চোখেমুখে আতঙ্ক। হাঁপাচ্ছে সে। টেবিলে ভর দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে সামলানোর চেষ্টা করল নিজেকে। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। শান একগ্লাস পানি ঢেলে দিল তাকে। কোনমতে অর্ধেক গ্লাস শেষ করল সে। শওকত ভ্রুকুটি করে বলল, ' কুকুর তাড়া করছিল নাকি? এমন করছিস কেন?'
পলাশ ভীত কন্ঠে বলল, ' ভয়ংকর ঘটনা ভাইয়া। আজ প্রায় সারাদিন ই কলের পর কল এসেছে।'
' কীসের কল?' প্রশ্ন করল শান।
পলাশ শুকনো ঢোক গিলে বলল, ' গতবার হুসাইন আলীর থেকে যেসব মাল এনে আমরা ডেলিভারি দিয়েছিলাম তাদের প্রায় সব জায়গা থেকে অভিযোগ এসছে। যত মাল আমরা পাঠিয়েছি তার প্রায় নব্বইভাগের নাকি ডিফেক্ট আছে। ঠিকঠাক কাজ করছেনা। ওগুলো কোনভাবেই ব্যবহারযোগ্য না। তারা সবাই টাকা ফেরত চাইছে। লাস্টে যে ডেডলাইন দিয়েছে তারটাও এই পনেরো তারিখের মধ্যে। সবশেষ ভাইয়া।'
শওকত মীর্জা হতবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন নিজের ভাইয়ের দিকে। করিম তাজওয়ারের বুকে ব্যথা শুরু হয়ে গেল। নিঃশ্বাস আটকে আসছে তার। এই তীব্র শীতেও সম্রাট আর শান দুজনেই ঘেমে উঠল। বুকের মধ্যে হাতুরি পেটাচ্ছে কে যেন। এ কী হল!
.
.
.
চলবে......................................................................