পাত্র-পাত্রীকে ছাদে আলাদা কথা বলার সুযোগ দেওয়া হলো। তাদের চা নাস্তাও এখানেই এলো।
প্রথম কথা পাত্রই বলল, ‘আপনার অনুমতি আছে তো বিয়েতে?’
লগ্ন চায়ের কাপ তুলে দিতে দিতে বলল, ‘বিয়ে তো ঠিক হয়ে যায়নি। এখনই এই প্রশ্ন?’
ছেলেটি চা নিতে নিতে হেসে বলল, ‘আমি বলিনি এই বিয়েতে অনুমতি আছে কি না। আমি জানতে চাচ্ছি এই যে আপনার বিয়ের কথা চলছে, পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছে এসব আপনার অনুমতিসাপেক্ষে হচ্ছে কি না।’
লগ্ন ভুরু কুঁচকে জানতে চাইল, ‘এরকম মনে হওয়ার কারণ কী?’
‘কারণ শুরু থেকেই আপনি মুখ ভার করে আছেন। আমি শুনেছি বাংলাদেশে আজকালকার মেয়েরা এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করে না। অন্তত মাস্টার্স শেষ করে নেয়, কেউ কেউ ক্যারিয়ার তৈরি করে এরপর বিয়ে করতে চায়। অনেকক্ষেত্রে এ ব্যাপারে পরিবারের মত থাকে না। তারা মেয়েকে জোর করে বিয়ে দিতে চায়। আমি এমন জোরে পড়তে চাই না। তাই জিজ্ঞেস করা।’
আসার পর থেকেই ছেলেটিকে দূর থেকে লক্ষ করছিল লগ্ন। ছেলেটির আচার-আচরণ, কথা বলার ধরন, পোশাক, ভদ্রতাজ্ঞান সবকিছুই মাৰ্জিত সব মিলিয়ে ভালোই লাগছে লগ্নর। উপরি পাওনা হিসেবে আছে সৌন্দর্য। লম্বা, স্মার্ট, দেখতে ভালো। চোখ দুটি দিয়ে যেন দ্যুতি ছড়াচ্ছে! কিন্তু তবুও স্বামী ভাবতেই অস্বস্তি হচ্ছে। অথচ অসভ্য- কদাকার হিমেলকে বিয়ে করার জন্য কত পাগলই না হয়েছিল সে!
লগ্ন মৃদু হেসে বলল, ‘ওরকম কিছু না। আমি একটু ডিস্টার্বড ছিলাম তাই ভালো ঘুম হয়নি। এজন্য হয়তো এমন লাগছে। আমিও মাস্টার্সের পরেই বিয়ে করতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু মাস্টার্স করতে বাইরে যেতে চাই। বাইরে গিয়ে বিদেশি কোনো ছেলেকে বিয়ে করে ফেলি কি না সেই ভয়ে সম্ভবত বাবা আমাকে এখনই বিয়ে দিতে চাইছেন।
একথা শুনে ছেলেটি হেসে ফেলল।
লগ্ন চায়ে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার নাম কী?’
‘ইফতেখার মাহমুদ।’
‘এতবড় নাম? ডাকনাম কী?’
‘সেরকম কোনো ডাকনাম নেই। তবে বাবা-মা ইফতি বলে ডাকে। আপনিও তাই ডাকতে পারেন।’
‘আচ্ছা। আপনি কী করেন?
ইফতি চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে বলল, ‘আমি বায়োডাটা পাঠিয়েছিলাম। আপনি পাননি?’
চায়ের কাপ নামিয়ে রাখতে দেখে লগ্ন পালটা প্রশ্ন করল, ‘চা ভালো হয়নি?’
‘না না ভালো। আমি আসলে এত গরম চা খেতে পারি না তাই।’
‘ও। যাই হোক, বাবা আমাকে আপনার বায়োডাটা দিয়েছিল। কিন্তু ওই যে বললাম আমি একটু ডিস্টার্বড ছিলাম। তাই দেখার সময় সুযোগ করে উঠতে পারিনি। বাবার আপনাকে অনেক পছন্দ হয়েছে, তাই আমি না দেখেই আসার অনুমতি দিয়েছি।’
‘আমি অবশ্য আপনার বায়োডাটা আর ছবি দেখতে দেখতে প্রায় মুখস্থ করে ফেলেছি।’
লগ্ন এবার জোরে হেসে উঠল।
বলল, ‘দেখি কোন ছবি পাঠিয়েছে আপনাকে?’
ইফতি মোবাইল থেকে ছবিগুলো বের করে দেখাল। লগ্ন আবারও হেসে দিলো।
হাসতে হাসতে বলল, ‘সবগুলো আমার তিন-চার বছর আগের ছবি। দেশি বাবা-মায়েরা পাত্রপক্ষকে পাঠানোর জন্য মেয়ের সবচেয়ে সুন্দর ছবিগুলো খুঁজে বের করে। ২৪ বছর বয়সি মেয়ের বিয়ে দিতে চাচ্ছে ২০ বছর বয়সি ছবি দেখিয়ে। দেখেছেন কান্ড!’
ইফতি এতক্ষণ মুগ্ধ হয়ে লগ্নর হাসি দেখছিল।
এবার ঘোরলাগা গলায় বলল, ‘বাস্তবে আপনি ছবির চেয়ে বেশি সুন্দর।’
লগ্ন প্রতিবাদ করে বলল, ‘কখনোই না। ডার্ক সার্কেলগুলো চোখে পড়ছে না আপনার? তখন কিছুই ছিল না। আর এইযে কপালের ওপর ব্রণটা এটা তো বিভৎস!’
‘এমন করে বললে তো ডার্ক সার্কেল আর ব্রণগুলোকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিতে হবে। অথচ এরা খুব ন্যাচারাল। বিয়ের পর সুখী হলেই এসব চলে যাবে।’
‘আপনি কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন বিয়ের পরে আমি সুখীই হব?’
ইফতি মৃদু হেসে বলল, ‘আমার সর্বস্ব দিয়ে সুখী করার চেষ্টা করব। মন বলছে আমাদের বিয়েটা হবে। কারণ এখানে আসার পর থেকেই আল্লাহর কাছে দোয়া করছি এটাই যেন আমার শেষ মেয়ে দেখা হয়।’
লগ্ন দুষ্টু হেসে বলল, ‘আমার তো এই প্রথম। আমি নাহয় আরো কিছু ছেলে দেখি।’
‘নিশ্চয়ই। বাজার যাচাই করে নেওয়া ভালো।’
ইফতি শব্দ করে হেসে উঠলো।
লগ্ন জিজ্ঞেস করল, ‘হাসছেন কেন?’
ইফতি বলল, ‘মা বলে আমার হাসি সুন্দর। তাই হাসি দিয়ে ইম্প্রেস করার চেষ্টা করছি।’
লগ্ন বহু কষ্টে হাসি আটকে রেখে বলল, ‘আমাকে এত পছন্দ হওয়ার কারণ কী?
ইফতি কোনো ভনিতা না করে স্পষ্ট গলায় বলল, ‘অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে মানুষ যে কারণে পছন্দ করে। একটা সুন্দর পরিবার, একটা সুন্দর মুখ। আপনার ছবি দেখেই আমার খুব পছন্দ হয়েছিল। এরপর আপনার বাবার সাথে দেখা করে খুব ভালো লাগে। তিনি অসম্ভব ভালো একজন মানুষ। তার মেয়ে নিশ্চয়ই তার মতোই হবে। আর আজ আপনাকে সামনাসামনি দেখে কথা বলে রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে গেছি। আমার মনে হয়েছে আপনি স্ত্রী ছাড়াও আমার খুব ভালো বন্ধুও হতে পারবেন। যার সাথে সব ধরনের বিষয়ে কথা বলে মজা পাওয়া যাবে।’
লগ্নই এবার মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
সে প্রসঙ্গ পালটে জানতে চাইল, ‘আপনি দেশে আছেন কতদিন?’
‘দেড় মাস।’
‘ওমা তাহলে তো খুব কম সময়। এত কম সময়ে একটা বিয়ের আয়োজন কীভাবে সম্ভব?’
‘আসলে আমি একসাথে খুব বেশি ছুটি পাই না। দু মাসের ছুটিতে এসেছি। বাবা-মায়ের কিছু প্রস্তুতি নেওয়াই ছিল। আমাদের দিক থেকে সমস্যা হবে না। আপনার বাবা বললেন তারও কোনো অসুবিধা নেই।’
লগ্ন চিন্তিত মুখে বলল, ‘সেসব নয়, দুজনের চেনাজানার জন্য তো কিছু সময় প্রয়োজন।
‘নিশ্চয়ই। তবে সেটা বোধহয় অল্প দিনে সম্ভব, আবার অনেক দিনেও সম্ভব নয়। আপনি ভেবে দেখুন কী করবেন।’
·
·
·
চলবে.........................................................................