মাস্টার্স শেষে লগ্ন একইসাথে অনেকগুলো বড় বড় কোম্পানিতে চাকরির আবেদন করে রাখল। যেহেতু সে আউটস্ট্যান্ডিং রেজাল্ট করেছে তাই আত্মবিশ্বাসও বেড়েছে। ইচ্ছে করেই প্রথমে বড় বড় সব কোম্পানিতে আবেদন করেছে। স্বপ্ন বড় হলে সফলতাও বড় হবে। স্বপ্ন ছোট হলে সফলতাও তো ছোটই রয়ে যাবে। যদি এসব কোম্পানিতে চাকরি না হয় তারপর নাহয় ছোটখাটো কোম্পানিতেও চেষ্টা করা যাবে।
অল্প কিছুদিনের মধ্যেই লগ্নর চাকরি হলো ওয়ালমার্ট কর্পোরেট অফিসে। পোস্টিং হলো টেক্সাসে। চলে গেল সেখানে। নতুন শহরে নতুন জীবন। আগে নতুন জায়গায় গিয়ে মানিয়ে নেওয়ার ভয় হতো। এখন বরং ভালো লাগে এই বৈচিত্র্য।
টেক্সাসে নিজের মনের মতো একটা এক কামরার অ্যাপার্টমেন্ট নিল লগ্ন। প্রথম মাসের বেতন পেয়ে পছন্দমতো ফার্নিচার কিনল। বারান্দায় গাছ লাগাল। একদম গুছিয়ে নেওয়া যাকে বলে।
আতিকুর রহমান ও বিলকিস বেগমও ভীষণ খুশি। তারা মেয়েকে নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তাতেই ছিলেন। যে অবস্থায় মেয়ে দেশ ছেড়েছে এরপর একা বিদেশ বিভুঁইয়ে নিজেকে সামলে নিতে পারবে কি না এটাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা। মেয়ে শুধু নিজেকে সামলেই নেয়নি বরং ভালোমতো পড়াশোনা করে ভালো একটা চাকরিও পেয়ে গেছে। এখন দেখেশুনে একটা ভালো বিয়ে দিতে পারলেই সব দুশ্চিন্তা শেষ হবে। কিন্তু বিয়ে নিয়ে লগ্নর সাথে কথা বলতেও ভয় লাগে তাদের। লগ্ন নিজেই যদি কাউকে পছন্দ করে বিয়ে করতে চাইতো তাহলে সবচেয়ে ভালো হতো। একবার ভুলভাল বিয়ে দিয়ে এমন অপরাধবোধে ভুগছে যে সারাক্ষণ মনে হয় নিজের হাতে মেয়ের জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছেন!
একদিন লগ্ন অফিস থেকে ফেরার পথে গেল বাজার করতে। বাজার করে এসে অ্যাপার্টমেন্টের দরজা খুলতে পারছিল না। লকটা কদিন ধরেই একটু সমস্যা করছিল। তবে এত বেহাল দশা ছিল না। তাই অতটা আমলে নেয়নি। অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও যখন পারল না তখন ভাবল কৰ্তৃপক্ষকে ফোন করবে। ঠিক তখনই পাশের ফ্ল্যাটের ছেলেটা এগিয়ে এসে স্পষ্ট বাংলায় বলল, ‘আমি হেল্প করব?’
ছেলেটিকে আসতে যেতে প্রায়ই দেখা যায়। সম্ভবত তাদের অফিস টাইম একই। প্রায়ই লিফটে দেখা হয়। তবে এর আগে কখনো কথা হয়নি। লগ্ন অবাক হয়ে বলল, ‘আপনি বাঙালি?’
ছেলেটি হেসে বলল, ‘শুধু বাঙালি না বাংলাদেশি বাঙালি।’
দরজা খুলতে ছেলেটিরও একটু কসরত করতে হলো। তবে সে খুলে দিতে পারল। লগ্ন ধন্যবাদ জানাল। ছেলেটি বলল, ‘লকটা নষ্ট হয়ে গেছে। আপনার ওনারকে বলুন ঠিক করে দিতে।’
‘হ্যাঁ বলব। আসলে কদিন ধরেই সমস্যা করছিল, আমিই গুরুত্ব দিইনি।’
ছেলেটি আবারও হেসে বলল, ‘আবার ভেতরে আটকে যেয়েন না যেন।’
লগ্ন হাসল।
‘ভালো থাকবেন। আমি এলাম।’
ছেলেটি এ কথা বলে চলে যেতেই লগ্ন তার বাজার নিয়ে ভেতরে ঢুকল।
এরপর আরেকদিন দেখা হলো কফিশপে। লগ্ন কফি নিয়ে বসার জায়গা খুঁজছিল তখনই ছেলেটি ডাক দিলো। বলল, ‘আমার টেবিলে জায়গা আছে। চাইলে বসতে পারেন।’
লগ্ন গিয়ে তার টেবিলে বসে বলল, ‘আপনার অফিস এদিকেই?’ হ্যাঁ। এই ডান পাশের বিল্ডিংয়েই। আপনার?’
লগ্ন লোকেশন বলতেই ছেলেটি বলল,
‘বাহ! ওয়ালমার্ট?’
‘জি।’
লগ্ন কফিতে চুমুক দিতেই ছেলেটি বলল, ‘আমি তাহসিন।’
‘আমি লগ্নজিতা।’
‘বাহ! খুব সুন্দর নাম।’
তাহসিন স্যান্ডউইচ আর কফি নিয়েছিল। লগ্ন শুধু কফি। তাহসিন স্যান্ডউইচের প্লেটটা এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘প্লিজ।’
লগ্ন বলল, ‘থ্যাংকস। আমি নাস্তা করেই বেরিয়েছি।’
‘ওকে।’
তাহসিন খেতে খেতে বলল, ‘আমার আবার রান্নাবান্নায় খুব আলসেমি। বাসায় কিছু করতে ইচ্ছে করে না। তিনবেলা বাইরের খাবার দিয়ে চালিয়ে দিই।’
‘কতদিন আছেন এখানে?’
‘বছরখানেক হবে। নর্থ ডাকোটা ইউনিভার্সিটিতে পড়তাম। পড়া শেষে ওখানে কিছুদিন জব করলাম, তারপর বেটার জব পেয়ে এখানে শিফট হই। আপনি এর আগে কোথায় ছিলেন?’
‘সিয়াটল।’
‘ইউনিভার্সিটি অব সিয়াটল?’
‘উঁহু। ওয়াশিংটন।’
লগ্নর কফি শেষ হতেই সে বলল, ‘আচ্ছা আমার অফিসের সময় হয়ে গেছে। আজ উঠি।
তাহসিন হেসে বলল,
‘শিওর।’
লগ্ন চলে গেল। তাহসিন চেয়ে রইল তার চলে যাওয়া পথের দিকে।
·
·
·
চলবে..........................................................................