সামনেই ক্রিসমাসের ছুটি। ইফতেখার মাহমুদের স্কুলের রিইউনিয়নের আয়োজন চলছে। শুধু এই রিইউনিয়নের জন্য দেশে গিয়ে ছুটিটা নষ্ট করতে ইচ্ছে করছে না। দেশে তার তেমন কেউই নেই। বাবা-মা বড় ভাইয়ের সাথে নিউ ইয়র্কে থাকে। এই ছুটিতে সেখানে যাওয়া উচিৎ।
এদিকে স্কুলের ফেসবুক গ্রুপটা রিইউনিয়ন নিয়ে মেতে আছে। এত আয়োজন দেখে যেতেও ইচ্ছে করছে। এরইমাঝে এক বন্ধু তাদের ব্যাচের পুরোনো এক ছবি দিয়েছে। ছবিটা দেখে একপ্রকার আতকে উঠলো ইফতেখার। কারণ ওই ছবিতে একজনকে নাদভি আহমেদ নামক সেই প্রতারকের মতো লাগছে। সঙ্গে সঙ্গে লগ্নর দেওয়া বিয়ের ছবি ও ন্যাশনাল আইডি কার্ড বের করল। বিয়ের ছবির সাথে খুব একটা মিল না থাকলেও ন্যাশনাল আইডির ছবির সাথে অনেকটাই মিল পাওয়া গেল। তার মানে এই নাদভিই তার স্কুলের ক্লাসমেট নাদভি! বয়সের সাথে চেহারার পরিবর্তনের কারণে সে চিনতে পারেনি। এজন্যই চেনা চেনা লাগছিল! ইফতেখার সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল লগ্নকে।
ইফতেখারের ফোন পেয়ে লগ্ন চমকে উঠল। কারণ প্রায় বছরখানেক পার হয়ে গেছে। সে ইফতেখারের কাছ থেকে কোনো খবর পাওয়ার আশা ছেড়েই দিয়েছিল।
‘হ্যালো।’
‘হ্যালো লগ্নজিতা, আমি ইফতেখার বলছি।’
‘জি, নম্বরটা এখনো সেভ করাই আছে। কেমন আছেন?’
ইফতেখার উত্তেজনা ধরে রাখতে পারছিল না। তাই হয়তো কুশল বিনিময়ের সৌজন্যতায়ও সে গেল না।
সরাসরি বলল, ‘লগ্ন নাদভির খোঁজ পেয়েছি।’
এক সেকেন্ডের জন্য লগ্নর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
পরক্ষণেই ইফতেখার বলল, ‘সরি সরি খোঁজ পেয়েছি বললে ভুল হবে। বর্তমানে কোথায় আছে আমি জানি না কিন্তু আমি ওকে চিনতে পেরেছি।’
‘নাদভি আপনার পরিচিত?’
‘হ্যাঁ। স্কুলের বন্ধু। অনেকদিন আগের ব্যাপার তাই ভুলে গিয়েছিলাম। আজ আমাদের স্কুলের গ্রুপে এক বন্ধু পুরো ব্যাচের একটা ছবি দিল, সেখানে দেখে চিনতে পারলাম।’
‘ছবিটা আমাকে পাঠাবেন?’
‘নিশ্চয়ই, আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি।’
‘কোন স্কুলে পড়তেন আপনি?’
‘ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ। সেভেন থেকে টুয়েলভথ পর্যন্ত আমরা একসাথেই পড়েছি।’
‘ক্যাডেট কলেজ!’
লগ্নর গলায় বিস্ময়!
ইফতেখার বলল, ‘জি।’
লগ্ন বিস্ময় কাটিয়ে একসময় বলল, ‘আর কিছু জানেন?’
‘হ্যাঁ। নাদভি খুবই ব্রিলিয়ান্ট ছেলে ছিল। ওর বাবা ডাক্তার ছিল। মা হাউজওয়াইফ। ফ্যামিলি স্ট্যাটাস ভালো। কলেজের পর ও কারো সাথে যোগাযোগ রাখেনি। কোথায় ছিল কোথায় পড়েছে কিছুই জানি না। যোগাযোগ না থাকায় আমি তো ওকে ভুলেই গিয়েছিলাম। তাই প্রথমদিন নাম শুনে চিনতেও পারিনি। ও হয়তো কোনোভাবে আমার সব খবর পেয়েছিল, সেটাকেই কাজে লাগিয়েছে। কিন্তু ওর মতো ছেলে এরকম নোংরা কাজের সাথে কীভাবে জড়াল আমার মাথাতেই আসছে না।’
‘বুঝতেই পারছি। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।’
‘মাই প্লেজার। ব্যাপারটার সাথে আমার নাম এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে এখন এ বিষয়ে আপনাকে সাহায্য করা আমার কর্তব্য মনে করছি। আমার বন্ধুদের থেকে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করব, এখন ওর ব্যাপারে কেউ কিছু জানে কি না। যদি আর কিছু জানতে পারি আপনাকে অবশ্যই জানাব।’
ইফতেখার বিদায় নিয়ে ফোন রেখে দিলো। লগ্ন ভাবতে লাগল ক্যাডেট কলেজে পড়া কোনো ছাত্রের যার ফ্যামিলি স্ট্যাটাস ভালো তার কেন এমন জালিয়াতি করতে হবে? তবে উত্তর মিলল না।
লগ্ন ইফতেখারের পাঠানো ছবি দেখছিল। নাদভির চেহারার অনেক পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু মুখটা তখনো নিষ্পাপ দেখতে ছিল, এখনো তেমনই আছে। কে বলবে এই ছেলেটি পরিকল্পিতভাবে এতবড় প্রতারণা করেছে!
ইফতেখার নাদভির ব্যাপারে আর কোনো তথ্যই দিতে পারলেন না। লগ্ন অবশ্য আশাও করেনি আর। যে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চায় তাকে খুঁজে পাওয়া কি এতই সহজ?
লগ্ন নাদভির চিন্তা মাথা থেকে সরিয়ে নিজের পড়াশোনা নিজের ক্যারিয়ারে ফোকাস করতে চায়। কিন্তু এমন একটি দিন নেই যে সে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নাদভিকে খোঁজে না বা তাকে নিয়ে ভাবে না। সকল ধরনের সোস্যাল মিডিয়াতেও খোঁজ করতে ভুল হয় না তার। কিন্তু নেই, কোথাও নেই সে। বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়ায় ইফতেখার মাহমুদ সাজা ফেইক আইডিগুলোও সে পালিয়ে যাবার পর থেকে বন্ধ। কত সহজেই না একটা মানুষ এসে জীবনটাকে তছনছ করে দিয়ে যায়! কীভাবে পারে? ধর্মীয় সব রীতিনীতি মেনেই তো তাদের বিয়ে হয়েছিল। কোনো অনুভূতিই কি হয়না ওর? অবশ্য প্রতারকদের এত অনুভূতি থাকলে তো প্রতারণাই করতে পারত না।
দিন কেটে যেতে থাকে লগ্নর। মাস্টার্সের শেষ বছরে তার জীবনে একটা দারুণ ঘটনা ঘটে। তার ইউনিভার্সিটিতে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়ে যায়। এতে করে তার বেকারির চাকরিটি আর করতে হয় না, উপরন্তু আয়ও বেড়ে যায়। নতুন অভিজ্ঞতার সাথে দারুণ কাটে বছরটি।
·
·
·
চলবে........................................................................