অদ্রি অৰ্পি কাঁদতে কাঁদতেই পৃষ্ঠা উল্টাল…
সেদিন সারারাত বাসায় ফিরিনি, পরেরদিন হসপিটালেও গেলাম না। সারাদিন রাস্তায় একা একা হাঁটলাম। রোদের প্রখর উত্তাপও টের পাচ্ছিলাম না। মানসীর গতকালের মুখটা বারবার মনে পড়ছিল। কীভাবে কাকুতি মিনতি করছিল ওর বাবার কাছে! আমার জন্য, শুধুমাত্র আমার জন্য! কতকিছু বলে বোঝাতে চেয়েছিলাম খালুকে, উল্টো সেই আমাকে আমার না বোঝা অনেক কিছু বুঝিয়ে দিল।
অনেক রাতে বাসায় ফিরলাম, ১/২টা তো হবেই। সঠিক মনে নেই। বেল বাজাতেই অনন্যা দরজা খুলল। আমি কিছু বলার আগেই অনন্যা বলল,
“দাদা কোথায় ছিলে? সেই যে কাল রাতে রাগ করে বের হলে তারপর আর খবর নেই। তোমার চিন্তায় মায়ের প্রেশার উঠে কী অবস্থা দেখো গিয়ে। কী করব কিছু বুঝতে পারছি না। সৌরভকে যে জিজ্ঞেস করব কীভাবে, ওর নাইট ডিউটি আজ, ফোনেও পাচ্ছি না। আমরা পুরো দিশেহারা।”
আমি মায়ের ঘরে ঢুকলাম, আমার পেছন পেছন অনন্যা আর দিতিয়া এল। মা শুয়ে ছিল, পাশে বাবা বসা ছিল। মা আমাকে দেখেই উঠে বসে কান্না শুরু করে দিল। আমি মাকে আবার শুইয়ে দিয়ে বললাম,
“একি অবস্থা মা? আমার কাজ ছিল তাই কাল ফিরিনি। আর এটা তো নতুন না। আগেও তো কতবার না বলে দূরে দূরে চলে গেছি। তখন তো এমন করতে না, এখন এত টেনশন কিসের তোমার?”
মা কাঁদতে কাঁদতেই বলল,
“কাল তো রাগ করে চলে গিয়েছিলি।”
“রাগ করে চলে গিয়েছিলাম তো কী হয়েছে? মাকে রেখে ছেলে যাবে আর কোথায়, ফিরে তো আসবেই তাই না?”
তারপর বাবাকে বললাম,
“তুমি কি মাকে একটু বোঝাতে পারো না?”
বাবা বলল,
“তোর মাকে তুই বোঝা, আমি কে? ৩১ বছর ধরে সংসার করছি, আজও আপন হতে পারলাম না।”
অভিমানের আভাস পেয়ে আর কথা বাড়ালাম না। সত্যি মানুষ বয়স হলে বাচ্চাদের মতো অবুঝ হয়ে যায়। মাকে আমি হুমকি দিলাম,
“কান্না থামাও নাহলে আবার চলে যাব।”
মা চোখ মুছে বলল,
“চল তোকে খেতে দেই।”
“তুমি খেয়েছ?”
“হ্যাঁ।”
“সত্যি করে বলো।”
অনন্যা বলল,
“আমি আর ভাবি মিলে একটু আগে যুদ্ধ করে খাইয়েছি।”
আমি বললাম,
“আচ্ছা তুমি এখন ঘুমাও। আমাকে খেতে দেয়ার মানুষ এ বাড়িতে অনেক আছে।”
“আমার ঘুম আসছে না রে বাবা।”
“হুম জানি, আমি একটা ইনজেকশন দিয়ে দিচ্ছি। তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমাও।”
মা বাচ্চাদের মতো ভয় পায় ইনজেকশনকে। তবু মায়ের অস্থিরতাটা কাটিয়ে ঘুমানোর জন্য একটা ইনজেকশন দিয়ে দিলাম।
তারপর নিজের ঘরে ঢুকে গোসল করলাম। গোসল করে বের হয়ে সোজা আমার প্রিয় বারান্দাটায় চলে গেলাম। পুরো বারান্দাটায় গ্রিল দেয়া, দেয়াল নেই তাই অনেক বড় বড় মনে হয়। বারান্দার ফ্লোরে বসে একটা সিগারেট ধরালাম। দিতিয়া বারান্দার দরজায় এসে দাঁড়াল। আমি বললাম,
“কী আমার পাশে বসতে চাও?”
ও মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলল। আমি বললাম,
“বোসো।”
ও বসল কিন্তু কিছু বলল না। আমিও চুপ করে রইলাম। একটা সিগারেট শেষ করে আরেকটা ধরিয়ে বললাম,
“কিছু বলতে চাচ্ছিলে মনে হয়। ভয় পাচ্ছ কেন, বলো কী বলবে।”
“খেতে দিয়েছি, না বোলো না প্লিজ। তোমার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে তুমি সারাদিন না খেয়ে আছ। তোমার হাঁটার ভঙ্গিতেও দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে।”
আমি ওর দিকে তাকাতেই ও বলল,
“আমাকে বকো, মারো, কাটো যা ইচ্ছে করো। তাও না খেলে ছাড়ব না আজকে।”
হঠাৎ খেয়াল হলো আমি গতকাল দুপুরে খাওয়া ছেড়ে উঠে গিয়েছিলাম মানসী এসেছে ভেবে। তারপর থেকে আর খাওয়া হয়নি। মনে পড়তেই ক্ষিদে অনুভব করলাম এবং খেতে বসলাম। বললাম,
“আর কাউকে দেখছি না যে?”
দিতিয়া ভাত প্লেটে তুলে দিতে দিতে বলল,
“সবাই আগেই খেয়ে নিয়েছে, মা অসুস্থ বলে জেগে ছিল। মাকে তো ঠাণ্ডা করা যাচ্ছিল না।
“ও…তুমি খাচ্ছ না কেন?”
“এইত নিচ্ছি।”
আমি খাওয়া শুরু করলাম। ভাত মুখে দিতেই পেটে মোচড় দিয়ে উঠল, মনে হলো মাটি খাচ্ছি, তাও খাচ্ছিলাম কারণ প্রচণ্ড ক্ষিদে পেয়েছিল। কিন্তু কেমন যেন মনে হচ্ছিল হজম হবে না কিছু। খেতে খেতেই হঠাৎ বমি এসে পড়ল। তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে বেসিনে বমি করে দিলাম। জ্ঞান হবার পর কখনো বমি করেছি বলে মনে পড়ে না। তাই এই তিক্ত অভিজ্ঞতাটা ছিল না আমার। মনে হচ্ছিল মাথা ঘুরে পড়ে যাব। দিতিয়া খাওয়া ছেড়ে দৌড়ে এসে হাত ধুলো। তারপর আমার মাথার দুপাশে দুহাত দিয়ে চেপে ধরে রাখল। আমি যতক্ষণ পর্যন্ত বমি করছিলাম ততক্ষণ ধরে রইল। নিজের বমির গন্ধে আমি নিজেই অস্থির, আর ও কী স্বাভাবিক! ওর মতো মেয়েরাই পারে!
বমি করার পর আমার শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ল। ও আমাকে ধরে ঘরে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপর আমার গলায় আর বুকে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
আমি চোখ বন্ধ করে রইলাম। ও বলল,
“যেটুকু খেয়েছিলে তার চেয়ে বেশি বেরিয়ে গেছে। এখন আবার কিছু খেতে হবে। কী খাবে বলো, আমি এনে দিচ্ছি।”
“আমি কিছু খাব না।”
“কিছু একটা খাও। এসিডিটির কারণেই এই অবস্থা। পেট খালি রাখা ঠিক হবে না। তুমি তো ডাক্তার মানুষ, আমি আর তোমাকে কী বলব?”
“আমি বমির ডাক্তার না, হার্টের ডাক্তার।
“আচ্ছা বেশ! এক গ্লাস দুধ খাও।”
“দুধ খাই না আমি। খেলে আবার বমি হবে। দুধের গন্ধ সহ্য করতে পারি না।”
“তাহলে কী খাবে?”
“কিছু না, এন্ড ফর গড সেক চুপ থাকো একটু।”
ও আর কোনো কথা বলল না। সারারাত আমার মাথার পাশে বসে বুকে হাত বুলিয়ে দিল, চুলেও হাত বুলিয়ে দিল। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম টের পাইনি।
—————
প্রায় এক সপ্তাহ পর সেই দিনটি এল। মানসীর বিয়ে! কীভাবে এই ক’দিন পার করেছি তা আল্লাহ জানে আর আমি জানি। একেকটা দিন একেকটা পাহাড়সমান কষ্ট বইতে হয়েছে নির্বিকারভাবে। সেদিন আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমার বিয়ের দিন মানসী কতটা কষ্ট পেয়েছিল।
আমাদের বাসা থেকে কেউ যাবে না মানসীর বিয়েতে। খালামণির সাথে মায়ের সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে আমাদের জন্য। দিনটি শুক্রবার ছিল। আমার অফ ডে। আমি ঘরেই শুয়ে ছিলাম। আমার আর তো কিছু করার নেই। যা ঘটেছিল, একটু দিতিয়ার চোখে বলি। মানে ওখানে আমি ছিলাম না তাই দিতিয়ার কাছ থেকে যা শুনেছি তাই লিখছি…
বিকেলবেলা মা নিজের ঘরে ছিল। অনন্যা, দিতিয়া ডাইনিং রুমে কাজ করছিল। বাবা আর সৌরভ ড্রইং রুমে কিছু একটা করছিল। হঠাৎ বেল বেজে উঠল। বেলের শব্দে মা ঘর থেকে বেরিয়ে এল। অনন্যা দরজা খুলতেই মানসীকে দেখতে পেল। একদম লাল বেনারসি পড়ে বউ সাজা। মানসী ভেতরে ঢুকতে যাবে এমন সময় পেছন থেকে খালামণি ওকে ধরে ফেলল। বলল,
“ফাজিল মেয়ে কোথাকার! একটু সুযোগ পেয়েই একবারে এখানে? দেখছিলি না আমি পেছন পেছন দৌড়াচ্ছিলাম, থামছিলি না কেন? অসভ্য মেয়ে! বলেছি না সারাজীবন এ বাড়ির ছায়াও মাড়াতে পারবি না!”
মানসী ওর মায়ের হাত ছাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
“নীরবদা কোথায়?”
স্পেসিফিক কাউকে জিজ্ঞেস করেনি, একজন উত্তর দিলেই হয়। দিতিয়াই বলল,
“ও ঘরেই আছে।”
মানসী দৌড়ে আমার ঘরে ঢুকেই দরজা লাগিয়ে দিল। খালামণি পেছন পেছন আসছিল কিন্তু আসার আগেই মানসী দরজা লাগিয়ে দিতে পেরেছিল। আমি দরজার দিকে তাকাতেই অবাক! লাল বেনারসি শাড়ি, গা ভর্তি গয়না, মাথায় ঘোমটা! আর দুচোখ ভর্তি কান্না! এক লাফে উঠে ওর কাছে যাচ্ছিলাম, তার আগেই ও ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার বুকে। আমিও ওকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। দরজায় অনবরত টোকা দিচ্ছে খালামণি, এমনকি আমার মাও। সেদিকে আমাদের দু’জনের কারোরই ভ্রুক্ষেপ নেই। একসময় মানসী আমাকে ছেড়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আজ আমার বিয়ে। দেখো, সুন্দর লাগছে না আমাকে?”
ওর চোখ বেয়ে জল পড়ছে। আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললাম। ও বলল, “আমি বউ সাজব আর আমার তুলতুলের বাবা দেখতে পারবে না তা কি হয় বলো?”
আমি উত্তেজনায় কথা বলতে পারছিলাম না। ও আমার বুকে হেলান দিয়ে বলল,
“কেমন লাগছে বলো?”
আমি ওর মুখটা দুহাতে তুলে ধরে বললাম,
“খুব সুন্দর লাগছে। খুব খুব। সারাজীবন তোকে এভাবে দেখতে ইচ্ছে করছে।”
তারপর আবার দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তুই আসলি কী করে?”
“বিউটি পার্লার থেকে বাসায় ফেরার সময় গাড়ি থেকে নেমে এক দৌড়ে চলে এসেছি।”
বলেই মানসী হেসে দিল। চোখ দিয়ে অনবরত জল পড়ছে, আর মুখে হাসছে মেয়েটা। আমি বললাম,
“চল পালিয়ে যাই।”
“তা হয় না। বাবাকে কথা দিয়েছি তোমার সাথে সম্পর্ক রাখব না। আজ তো কার না কার সাথে বিয়ে হয়ে চলেই যাব শ্বশুরবাড়ি। দু’দিন পর কানাডা। আর কখনো দেখা হবে কিনা জানি না তাই দেখা করতে এলাম। আর দেখাতে এলাম তোমার বউকে বউ সাজলে কেমন লাগে।”
একথা বলে মানসী আবার হাসল। তারপর আমার শার্টের উপরের দুটো বোতাম খুলে বুকের মধ্যে কামড় দিল। প্রচণ্ড ব্যথা পেলাম। ও মুখটা সরিয়ে নিতেই দেখলাম ওর দাঁতের ধারে ভয়ঙ্করভাবে কেটে গেছে আমার বুকের অনেকটা অংশ। আর সেখান থেকে রক্ত বের হচ্ছে। ও আবার হেসে বলল,
“এই দাগ সারাজীবন থাকবে। দেখবে আর আমার কথা মনে করবে।”
আমিও হাসলাম। ও বলল,
“শোনো, দিতিয়াকে ছেড়ো না। অন্য কোনো মেয়ের সাথে তোমাকে সহ্য করতে পারব না আমি। ওর সাথে পারব, ওকে নিজের আপন কেউ মনে হয়। আর ওর কাছে তোমাকে ভরসা করে দিতেও পারব, যেভাবে অন্য কারো কাছে পারব না। তাই ওকে ছেড়ো না, ওর সাথেই থেকো।”
আমি কিছু বললাম না। ও বলল,
“এই শোনো, তোমার আর দিতিয়ার মেয়ে হলে নাম রাখবে তুলতুল। আর ছেলে হলে রাখবে দিহান। আমার মেয়ে হলেও নাম রাখব তুলতুল, ছেলে হলে দিহান। যেমনটা আমরা ঠিক করে রেখেছিলাম।”
কথা শেষ করে আবার হাসল মানসী। খিলখিলিয়ে হাসছিল। আমিও ওর হাসিতে যোগ দিলাম। কিন্তু ওর চোখে জল ছিল, আমার চোখে ছিল না। ধাক্কাধাক্কিতে দরজা ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলো! সেদিকে খেয়াল করার সময় আমাদের নেই। ও বলল,
“শোনো, তোমাকে একটা কথা কখনো বলা হয়নি আজ বলব, আজ না বললে আর বলা হবে না।”
“কী বল?”
“তুমি যে আমার কানে চুমু খেতে সেটা আমার খুব পছন্দ ছিল। খুব ভালো লাগত।”
আমি সাথে সাথে ওর বাম কানে চুমু খেলাম। ও শিউরে উঠল। তারপর বলল,
“তোমার কোলে উঠতে আমার খুব ভালো লাগত।”
আমি সাথে সাথে ওকে কোলে তুলে নিলাম। ও আমার ঘাড় জড়িয়ে ঝুলে ঝুলে হাসতে লাগল। আর বলল,
“আজ আমি অনেক খুশি।”
আমি ওর চুলের ঘ্রাণ নিচ্ছিলাম। ও বলল,
“আরো বেশি করে নাও। যেন তোমার মৃত্যুর দিন পর্যন্ত এই ঘ্রাণ পাও।”
আমি তাই করলাম। তারপর একসময় বলল,
“এবার আমাকে যেতে হবে। তা না হলে বাবার কাছে ধরা খাব। আর সময়মতো চলে যেতে পারলে বাবাকে বলার সাহস মা করতে পারবে না। যেতে দাও।”
আমি ওকে কোল থেকে নামালাম। ও আবার আমার গলা জড়িয়ে বলল,
“আই লাভ ইউ।”
“আই লাভ ইউ টু সোনাবউ।”
ও আবার ওর সেই বিখ্যাত হাসিটা দিল। চোখের জলও সাথে আরো দুফোটা গড়াল। মানসী দরজার কাছে গিয়ে লকে হাত দিয়ে ঘুরে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপর আবার ছুটে এল আমার কাছে। পাগলের মতো আমার ঠোঁটে চুমু খেলো। ওর চোখের জল টপটপ করে পড়ছিল আমার গালে, ঠোঁটে। তারপর যখন সরে যাচ্ছিল আমি ওর হাত ধরে থামিয়ে বললাম,
“আরেকটা কান্নাচুমু দিবি অনেকক্ষণ ধরে?”
কথা শেষ হতেই আমার আবদার রাখল মানসী। আমি একই সাথে পান করছিলাম ওর ঠোঁটের অমৃত আর চোখের জলের নোনাবিষ!
নীরব ইশতিয়াক
২৬ এপ্রিল, ২০১৬
·
·
·
চলবে..........................................................................