চেকমেট - পর্ব ২৬ - সারিকা হোসাইন - ধারাবাহিক গল্প


          পুব আকাশে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে নিঃশব্দে।মেঘের ঘন কালো আস্তরণ ধীরে ধীরে জালের ন্যয় বিস্তৃতি লাভ করছে পুরো আকাশ জুড়ে।থোকা থোকা মেঘ রাশি ক্ষীণ ঝাপসা আলো বিলিয়ে দেয়া রুপোলি চাঁদ কে গভীর মমতায় ঢেকে নিলো।মুহূর্তেই গগন কাঁপিয়ে ঝরঝর শব্দে ঝরে গেল হীম ধারা।

সারফরাজ একটুও চমকালো না হঠাৎ জল স্পর্শে।সে এখনো কাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে বেলকনির দিকে।রূপকথা সারফরাজ এর ঝাপসা নীল চোখ জোড়ায় দৃষ্টি রেখে অভিমানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রয়েছে।মনে কোনো দ্বিধা সংশয় কিচ্ছুটি নেই।শুধু অল্প পরিমাণ অভিযোগ আর অনুযোগ।

সারফরাজ এর উম্মুক্ত শক্ত বক্ষে বর্ষণ ধারা আছড়ে পড়ছে সমান তালে।সেগুলোর উপর রূপকথার সামান্য ঈর্ষা হলো বোধ হয়।বাঁকা চোখে সারফরাজ এর লোম হীন প্রশস্ত বুকে একবার নজর বুলিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠলো

'ওই বুকে আমি আরো আগুন জ্বালিয়ে পুড়ে কয়লা বানিয়ে দেবো।বৃষ্টির জলের সাহস কতো।

ঘন বৃষ্টির ঝিরি ঝিরি ধারা ভেদ করে এবার আর রূপকথার মায়াবী মুখশ্রী দেখতে পেলো না সারফরাজ।নেশায় পুরো শরীর মাথা টলছে।ঝাপসা চোখে বৃষ্টির জলের পানে তাকিয়ে বুক চেপে ধরে সারফরাজ এলোমেলো গলায় বলে উঠলো

"শালার হৃদয়ের আগুন টা বৃষ্টির জলেও নিভে না।কি কঠিন দহন মাইরি।

টলতে টলতে ভেজা আঙিনার ঘাসের উপর হাটু মুড়ে বসে গেলো।এরই মাঝে বিকট শব্দে বাজ পড়লো।তাতে সারফরাজ তাচ্ছিল্য হেসে বললো

"বুকের ভেতরের হাহাকার এর আওয়াজ বাইরে পর্যন্ত তর্জন গর্জন করে শব্দ তুলছে।পাঁজরের নীচে এতোই জন্ত্রনা বুঝি?

সারফরাজ কে পরে যেতে দেখে আর অভিমান করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না রূপকথা।সদর দরজা খোলা বৃষ্টির জল ঠেলে দৌড়ে এলো সারফরাজ এর সামনে।এরপর মিহি স্বরে ডাকলো সারফরাজ!

সারফরাজ রূপকথার ডাক শুনে উপরে মাথা তুলে তাকালো।এরপর গাড়ির ফ্রন্ট বাম্পারে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালো।বৃষ্টির জলে রূপকথার কাঁধ সম চুল গুলো লেপ্টে আছে।চোখ মুখ সদ্য প্রস্ফুটিত শিশির স্নানে ভেজা গোলাপের ন্যয় ঠেকলো সারফরাজ এর কাছে।রূপকথার স্বর্গীয় রুপে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যয় রূপকথার দিকে ঝুঁকে দাঁড়ালো সারফরাজ ।এরপর দুই হাতের আজলায় রূপকথার কোমল মুখশ্রী ধরে কম্পিত গলায় বলল

"দ্যা রিয়েল প্রিন্সেস অফ ফেইরীটেইল।

রূপকথা সারফরাজ এর চোখের দিকে তাকিয়ে ভারী স্বরে শুধালো

"তুমি মদ খাও?

সারফরাজ মাথা ঝাঁকালো।এরপর ব্যাথাতুর মুখে বলে উঠলো

"বুকের এখানটায় অনেক অনেক যন্ত্রণা রূপকথা।সেই যন্ত্রণা কাউকে বলা যায় না।এই যে কোটি কোটি টাকার গাড়ি,এই যে গায়ের দামি পোশাক টাকা পয়সা রাজত্ব কোনো কিছুই বুকের এই যন্ত্রনা কমাতে পারে না।দগদগে হৃদয় খালি ছটফট করে।কেউ খোঁজ রাখে না।

রূপকথার মায়া হলো সারফরাজ এর জন্য।সে আলগোছে সারফরাজ এর বুকে মাথা ছুঁইয়ে শুধালো

"এবার?

বোকার মতো অল্প হাসলো সারফরাজ।এরপর ধরা গলায় বলল

"আরাম লাগছে।

রূপকথা সারফরাজ কে শক্ত হাতে জড়িয়ে অভিমানী গলায় বলল

"কাল কষ্ট দিয়েছিলে কেনো?

"আমি খারাপ মানুষ তাই।

"তুমি খারাপ?

"হু।আমি মনস্টার,দৈত্য, দানব উশৃঙ্খল পশু।

রূপকথা সারফরাজ এর ঠোঁট এ সরু আঙ্গুলি চেপে ধরে বলে উঠলো

"হুশ পঁচা কথা বলে না।

ঠোঁটে রূপকথার আঙুলের শীতল স্পর্শ পেয়ে কেঁপে উঠলো সারফরাজ।হৃদ গতি তেজ হলো তিন গুণ হারে।বুকের খাঁচা ভেঙে এই বুঝি হৃদপিণ্ড বাইরে বেরিয়ে আসে।রূপকথার হাতের কব্জিতে চেপে ধরে সারফরাজ নেশাক্ত গলায় বলল

"আমি পাপী।আমি আর মানুষ নেই রূপকথা।আমার কাছে এসো না।পাপের তাপে তুমিও পুড়ে যাবে।জানো না ?কেউ মরে পাপে কেউ তাপে?

রূপকথা শক্ত ঠোঁটে বললো

"তুমি এসেছো সারফরাজ।

রূপকথার চট করে করা উত্তরে অল্প বাঁকা হাসলো সারফরাজ।এরপর বললো

"বেশ বড় হয়ে গেছো তাই না?বড়দের মুখে মুখে কথা বলো।

রূপকথা সারফরাজ এর বুক থেকে মাথা তুলতে চাইলো।সারফরাজ ঠেসে ধরে বলে উঠলো

"আগুন নিভে অঙ্গার থেকে ধোয়া উড়ছে ।আর কিছু সময় পর ধোয়া থেমে যাবে।

রূপকথা সারফরাজ এর পুরুষালি গন্ধ আর নিকোটিন এর গন্ধে চোখ বুজে বলে উঠলো

"সিগারেট ফুকেছো?

"অনেক।

"কেনো?

"মাঝে মাঝে নিজেকে পোড়াতে শান্তি লাগে।কিন্তু আমার সেই শান্তি বিনষ্ট করছো তুমি।ঠিক পস্তাবে।

"পস্তাতে চাই আমি।

"বোকা মেয়ে।নিস্তার পাবে না আমার হাত থেকে।

"আমি নিস্তার চাই না"

"রিয়েলি?

"হ্যা।

সারফরাজ অবাক চোখে রূপকথাকে দেখলো।এরপর বললো

"সময় নাও।

রূপকথা চোখ বুজেই প্রত্যুত্তর করলো

"বারোটা বছর সময় নয় কি?নাকি তোমার নাগাল পেতে আরো যুগযুগ এর প্রতীক্ষা প্রয়োজন?

সারফরাজ জবাব দিলো না।শুধু বললো

"আমি সত্যিই পাপী।

"পাপ ধুয়ে দেবার দায়িত্ব আমি নিতে চাই।

সারফরাজ বুক থেকে সরিয়ে দুই কাঁধে চেপে ধরে রূপকথার চোখে চোখ রাখলো।এরপর বলে উঠলো

"ভালোবাসা আমি বুঝিনা।আমার কাছে হিংস্রতা ছাড়া আর কিছুই নেই রূপকথা।আবেগে গা ভাসিয়ে ভুল করছো তুমি।পরে কাঁদবে।

রূপকথা ধীর লয়ে বললো

"সেই কান্নার জল যদি তোমার বুকের আগুন নেভাতে পারে তবে আমি আজীবন কাঁদতে রাজি।

শীতল বাতাস আর বৃষ্টির ভারী ধারা রূপকথার শরীরে কাপন তুললো সেই সাথে তিরতির করে কেঁপে উঠলো গোলাপি ঠোঁট জোড়া।সারফরাজ অবাক চোখে এহেন মোহনীয় দৃশ্য উপভোগ করলো।এরপর বুক চেপে ধরে বলল

"আমাকে যেতে হবে রূপকথা।বুকের কন্ডিশন শোচনীয়।

রূপকথা উদ্বিগ্ন চোখে বললো

"ব্যথা হচ্ছে?

"নাহ।বাসনার তাড়না হাতুড়ি পেটাচ্ছে।ওসব তুমি বুঝবে না।

বলেই রূপকথাকে ফেলে গাড়িতে উঠে বসলো সারফরাজ।এরপর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে জানালার কাচ নামিয়ে উঁচু আওয়াজে বললো

"আমি মরে গেলে আমার ছায়াও কিন্তু তোমার পিছু ছাড়বে না।ভেবে চিন্তে ডিসিশন নিও ।পরে কিন্তু মুক্তি পাবে না।

বলেই গাড়ি হাঁকালো সারফরাজ।রূপকথা ঠোঁট টিপে হেসে বলে উঠলো

"পাগল একটা।

সারাফরাজ এর গাড়ি দৃষ্টি সীমানা থেকে মিলিয়ে যেতেই ভেজা শরীরে পা টিপে ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দিলো রূপকথা।এরপর পা টিপে টিপে সিঁড়ি বেয়ে নিজ কক্ষে ঢুকলো।কক্ষে বিছানার উপর নেলিকে দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত হলো রূপকথা।বোকা নেলি কেমন চতুর চোখে রূপকথার পানে তাকিয়ে আছে।রূপকথা নেলিকে দেখে ভয়ার্ত মুখে শুধালো

"ঘুমাস নি?

নেলি মাথা দুলিয়ে বললো

"সারফরাজ এসেছিলো?

রূপকথা অল্প করে উত্তর দিলো

"হু।

"প্রেমে পরলি?

"জানিনা।

"বালিশের তলায় বন্দুক রাখে ওই ছেলে।নিশ্চয় সাধারণ মানুষ বালিশের তলায় বন্দুক রেখে ঘুমাবে না।তাই না?

"নেলি ও খারাপ মানুষ সেটা স্বীকারোক্তি দিয়েছে আমার কাছে।কিন্তু আমি ওকে ফেরাবো তুই দেখিস।

নেলি তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলে উঠলো

"মামা মামী কষ্ট পাবে রূপকথা।তুই ভুল পথে হাঁটতে চাইছিস।

রূপকথা কোনো উত্তর না দিয়ে শুকনো কাপড় নিয়ে ওয়াশ রুমে চলে গেলো।ঝটপট কাপড় পাল্টে বেরিয়ে নেলিকে আগের জায়গাতেই পেলো।হয়তো উত্তর শোনার আশায় অপেক্ষা করছে নেলি।নেলির ভাব ভঙ্গি বুঝতে পেরে রূপকথা নিচু গলায় বললো

"সারফরাজ এর সাথে আমার বন্ধন একদিন দুদিনের নয় নেলি।ও আমার কোনো ক্ষতি করবে না এবং হতেও দেবে না।ওকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করি আমি।

নেলি আর কথা বাড়ালো না।শুধু অবিশ্বাসের গলায় বলল

"বেস্ট অফ লাক।

নেলি চলে যেতেই দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো রূপকথা।এরপর শীতল শরীর উষ্ণ করার উদ্দেশ্যে কাঁথা গায়ে জড়িয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠলো

"তুই কি করে বুঝবি নেলি সারফরাজ এর বুকে আমি কতোটা শান্তি পাই?ওটা যে আমার নিরাপদ আশ্রয়স্থল।বাবা মা হারানোর পর ওখানেই তো আমার বাস ছিলো।সে যে আমাকে আগলে নিতে জানে।

—————

সকালে বেশ দেরিতে ঘুম ভাঙলো সারফরাজ এর।ঘুম থেকে উঠেই ফোন হাতে নিলো সারফরাজ।এরপর স্ক্রিনে সময় দেখে নিলো।বেলা প্রায় মধ্য দুপুর ।এরপর একবার আজকের তারিখটা পরখ করলো।আলগোছে হাতের ফোনটা বালিশের পাশে রেখে চোখ বুজে সটান শুয়ে রইলো কিছু সময়।এরপর পুনরায় ফোন হাতে নিয়ে অভিরূপ কে মেসেজ পাঠালো

"দুপুর দেড়টার ফ্লাইটে লুইস আর ইয়ং ল্যান্ড করবে।প্লিজ রিসিভ করে নিস ওদের।

ছোট বার্তখানা পাঠিয়ে উপুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজলো।ঝাপসা এলোমেলো স্মৃতি পটে গত রাতের মুহূর্ত ধরা দিলো।অনন্য ভালো লাগায় পাশ বালিশ চেপে ধরলো সারফরাজ।এরপর ঘুম জড়ানো গলায় নিজেকে নিজেই শুধালো

"সিরিয়াসলি?

ভেতর থেকে আসা উত্তরে লাজুক হাসলো সারফরাজ।এরপর বালিশে কয়েকটা পাঞ্চ মেরে ভাঙা গলায় বলে উঠলো

"কি সাংঘাতিক বিচ্ছু মেয়ে।আমাকে কুপোকাত করে তবেই ক্ষান্ত হলো।

ঘড়ির কাটা তরতর করে আরো খানিক সময় গড়ালো।আর শুয়ে থাকতে পারলো না সারফরাজ।আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়ালো।এরপর চলে গেলো ফ্রেশ হতে।

—————

মেডিকেল কলেজের ফার্স্ট ডে থাকায় সকাল বেলা ক্লাসে এটেন্ড করার জন্য না খেয়েই চলে এসেছে নেলি আর রূপকথা।দুপুরের আগে আগেই খিদেয় তালগোল পাকিয়ে গেলো নেলির।ক্যান্টিন থেকে দ্রুত অল্প কিছু খেয়ে ফিরে আসলো লাইব্রেরি তে।এরপর মেডিকেল সায়েন্স এর উপর লিখা একটা বই নিয়ে নাড়াচাড়া করলো রূপকথা।প্রথম দিন জন্য সব কিছুতেই কেমন এক্সাইটমেন্ট কাজ করলো তার ভেতর।

নেলি রুটিন চেক করে রূপকথার উদ্দেশ্য বলে উঠলো

"পরের ঘন্টায় ক্লাস আছে।

রূপকথা ভাবুক হয়ে শুধালো

"কি ক্লাস?

"ফিজিওলজি।

রূপকথা আর কিছু শুধালো না।কিন্তু নেলি মন মরা হয়ে রইলো।রূপকথা নেলির দিকে তাকিয়ে শুধালো

"মন খারাপ কেনো?

কলম কামরাতে কামড়াতে নেলি উত্তর করলো

"দুটো ক্লাস করলাম একটাতেও কোনো ইয়ং হ্যান্ডসাম ডক্টর দেখলাম না।যা দেখলাম সব ঘাটের মরা।অথচ গল্প উপন্যাস বা মুভিতে কি সুন্দর সুন্দর ডক্টর লেকচারার।ধ্যাত মোডটাই পানসে হয়ে গেলো।

রূপকথা নেলির ভাবনায় কপাল কুঁচকে শুধালো

"পড়তে এসেছিস নাকি জামাই খুঁজতে?

নেলি বোকা চোখে রূপকথার পানে তাকিয়ে বলে উঠলো

"নিজে তো একটা জুটিয়ে নিয়েছো এজন্য আমার মতো সিঙ্গেল মানুষের ব্যাথা বুঝতে পারছো না।

রূপকথা হাত ঘড়িতে একবার সময় বুলিয়ে বললো

"চল নেক্সট ক্লাসের সময় হয়ে যাচ্ছে।

নেলি ঠোঁট উল্টে মন খারাপের ভং করে উঠে রূপকথার পিছু পিছু ছুটলো।এরপর ক্লাসে ঢুকে মাঝ খানের আসনে বসলো।

ক্লাসে সবাই যখন এটা সেটা নিয়ে আলোচনা করছিলো ঠিক তখন হেলেদুলে একজন প্রফেসর এলেন।তাকে সম্মান প্রদর্শন করে নেলি কপাল চাপড়ে বললো

"এতো কবরে অলরেডি ঢুকে গেছে রে রূপকথা।

রূপকথা দাঁত পিষে চোখ গরম করে নেলির এহেন বেফায়েসে কথায়।
ফিজিওলজি লেকচারার নিজের নাম পরিচয় দিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো

"আমি আজ আপনাদের ক্লাস নেবো না।একজন গেস্ট ডক্টর এসেছেন আমাদের হসপিটালে।তিনি আজ আপনাদের ক্লাস নেবেন।

বলেই বেরিয়ে গেলেন এনায়েত উল্লাহ।এনায়েত উল্লাহ চলে যেতেই ক্লাস জুড়ে শোরগোল সৃষ্টি হলো।সেই শোরগোল কে আরো দুই ধাপ বাড়াতে ভেতরে প্রবেশ করলো লম্বা চওড়া অত্যাধিক ফর্সা সুদর্শন এক যুবক।তাকে দেখে পুরো ক্লাসের মেয়েরা যেনো জ্ঞান হারানোর উপক্রম হলো।যুবক সকলের উদ্দেশ্যে গম্ভীর ভারী গলায় বলে উঠলো

"লেটস গেট ইন্ট্রোডিউসড ফার্স্ট।আম ডক্টর রুদ্র। ডক্টর রুদ্ররাজ চৌধুরী।

—————

ক্লাস জুড়ে সকলের দৃষ্টি শান্ত স্থির।সামনে দাঁড়ানো স্বপ্নের পুরুষের ন্যয় অধিক সুদর্শন লেকচারার কে দেখে ক্লাসের মেয়ে স্টুডেন্ট গুলো পলক ফেলতে ভুলে গেছে যেনো।উপস্থিত ছেলেরাও ফিসফিস করে এটা সেটা বলছে।কিন্তু এসবের ধার যেনো ধারলো না রুদ্র।সে তার গাম্ভীর্য আর রহস্যে অটল থেকে সাদা শার্টের হাত কুনুই অব্দি গুটিয়ে হোয়াইট বোর্ডে ঘচঘচ করে মার্কার দিয়ে লিখলো

"ফাইট ওর ফ্লাইট রেসপন্স।

লেখাটি লিখে শেষ করে সামনে ফিরলো রুদ্ররাজ।ঠোঁটে ঠান্ডা হাসি গাঢ় আকাশি চোখে ইন্দ্রজাল এর খেলা।
রুদ্র পুরো ক্লাস জুড়ে একবার চতুর নজর বুলালো।ক্লাসের কেউ ঠোঁট টিপে ড্যাব ড্যাব করে তাকে দেখে চলছে কেউ ডায়েরির আড়ালে চোখ রেখে গোপনে নিঃশব্দে তাকে পরখ করছে।এসব দৃশ্যে রুদ্র কোনো প্রকার হেলদোল দেখালো না।তার চোখ যেনো অন্য কিছু খুঁজে চলেছে ক্লাস জুড়ে।
এদিকে নেলি রুদ্রের চোখের মনিতে খেই হারিয়ে ক্যাবলা কান্তের মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো।এমন বেহায়া দৃশ্যে রূপকথা নেলির হাতে চিমটি কেটে বলে উঠলো

"এই লোকটা ট্রেনে একই কেবিনে এসেছে আমার সাথে।উনাকে একেক দিন একেক রূপে দেখে অবাক হচ্ছি আমি।

বলেই গোপনে নিজের ফোন বের করে ছবি তুলতে উদ্যত হলো।কিন্তু তার আগেই ভরা ক্লাসে গমগমে আওয়াজে রুদ্র আঙ্গুলি ইশারা করে বলে উঠলো

"হেই ইউ,ইন দ্যা থার্ড রো।

রুদ্রের গলার স্পষ্ট আওয়াজে কেঁপে উঠলো রূপকথা।ফোন লুকিয়ে সম্মুখ লেকচার টেবিল পানে তাকাতেই রুদ্র মাথা ঝাকিয়ে বলে উঠলো

"ইয়েস ইউ।

রুদ্রের আঙ্গুলি নির্দেশে রূপকথা চারপাশে বেকাবু তাকিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো।রূপকথার পানে ক্লাসের সকল মেয়ে তাকিয়ে রইলো।নতুন প্রফেসর আসতে না আসতেই নতুন ক্লাসে কি প্রশ্ন করতে পারে এই মেয়েকে তা যেনো কারো মাথায় ঢুকলো না।

দুই আঙুলে মার্কার টাকে বেশ কায়দা করে ঘোরাতে ঘোরাতে রূপকথার সামনে এসে দাড়ালো রুদ্র।এরপর অল্প ঝুকে অদ্ভুত গলায় শুধালো

"হুয়েন সাম ওয়ান ফেসেস আন এক্সপেক্টেড ড্যাঞ্জার,লাইক উম... লুজিং দ্যা অনলি পার্সন দে লাভ!হুইচ নার্ভাস সিস্টেম টেইকস ওভার ফার্স্ট?

রুদ্ররাজ এর অদ্ভুত প্রশ্নে রূপকথা অবাক চোখে রুদ্রের কঠিন হাস্যজল মুখের পানে তাকিয়ে রইলো।রুদ্রের চোখ দুটোতে কেমন চতুরতার খেলা।ঠোঁটে ঠান্ডা হাসি।চাহনি নির্লিপ্ত অথচ গভীর।
রূপকথা ফার্স্ট ক্লাসে এমন প্রশ্নে কিছুটা ঘাবড়ে গেলো।সে এসবের উত্তর জানেনা।ফার্স্ট বই কিনে কৌতূহল বসত দুই তিন চ্যাপ্টার রিডিং পড়ে ছিলো।সেখানে এমন অধ্যায় পড়েছে বলে মনে পরে না।তবুও মস্তিষ্ক ঘেঁটে কিছু মনে করবার চেষ্টা করলো রূপকথা।এরপর ফট করে বলে উঠলো

"আই থিংক সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম স্যার।

রূপকথার উত্তরে রুদ্র মাথা ঝাকিয়ে বললো

"ব্রিলিয়ান্ট।
বলেই হাত তালি দিলো।পুরো ক্লাসের মেয়ে গুলো কেমন ঈর্ষান্বিত চোখে দেখতে লাগলো রূপকথাকে।রুদ্রের হাত তালিতে রূপকথার মনে কোনো আনন্দ হলো না।বরং অযাচিত অজানা এক ভয় এসে বুকের মাঝে হানা দিলো।

রূপকথার ভয়কে দ্বিগুন বাড়িয়ে গম্ভীর গলায় নাটকীয় ভঙ্গিতে রুদ্র বলে উঠলো

"এক্সাক্টলি।এমন সিচুয়েশন এ পড়লে আমাদের হৃদয়ের গতি তেজ হয়,নিঃশ্বাসের গতি বেড়ে যায়।মনে হয় এই বুঝি প্রাণ গেলো রাইট?সেই সাথে চিবুক গড়িয়ে ঘাম গড়ায়।বাট মিস!

কথাটি বলে রূপকথার পানে বাঁকা চোখে তাকিয়ে রইলো রুদ্র।রূপকথা রুদ্রের চাহনির মানে বুঝতে পেরে মাথা নত করে প্রত্যুত্তর করলো 

"রূপকথা।রূপকথা চৌধুরী।

রুদ্র স্মিত হেসে বললো

"নাইস নেইম।তো মিস রূপকথা টেল মি ওয়ান থিং।হ্যাভ ইউ এভার ফেল্ট দ্যাট সিচুয়েশন রিসেন্টলি?

রুদ্রের তির্যক প্রশ্নে কেমন কেঁপে উঠলো রূপকথা।মানুষটার কথা বার্তা তার মোটেও ভালো লাগছে না।এতো এত স্টুডেন্ট এর ভিড়ে রূপকথাকে ই কেনো এসব জিজ্ঞেস করছে এই রুদ্ররাজ?

এদিকে রূপকথার পানে তাকীয়ে ঠোঁট টিপে হেসে চলেছে ক্লাসের মেয়েরা।রূপকথার নাজেহাল চেহারা দেখে তারা যেনো বেশ আনন্দ পেলো।রূপকথা রুদ্রের পানে তাকিয়ে ইতস্তত করে নিভু গলায় বলল

"ক্যান আই সিট?

রুদ্র গম্ভীর গলায় উচ্চস্বরে বলল

"নো।"

রূপকথা রুদ্রের ধমকে কেঁপে উঠে ভীত মুখে একবার রুদ্রের পানে নজর বুলালো।রূপকথার ভীত মুখশ্রী দেখে ফিক করে হেসে দিয়ে রুদ্র বলে উঠলো

"জাস্ট কিডিং।প্লিজ সিট ডাউন।

রুদ্রের এহেন আচরণ কেমন অদ্ভুত লাগলো রূপকথার।রুদ্রের সারহে সাথে ক্লাসের মেয়ে গুলোও শব্দ করে হেসে উঠলো।ফার্স্ট দিনে এমন নাস্তানা বুদ হয়ে চোখ ফেটে জল এলো রূপকথার।তবুও নিজেকে সামলে মাথা নিচু করে বসে গেলো রূপকথা।রূপকথার পানে তাকিয়ে রুদ্র ঠোঁট কামড়ে মনে মনে বলে উঠলো

"আ উইল বার্ন এভরিথিং ইউ লাভ ডিয়ার সারফরাজ। তোর চোখের যেই আগুন দিয়ে সব কিছু জ্বালিয়ে দিচ্ছিস সেটার উত্তাপ হীন ছাই দেখতে চাই আমি।এবং সেটা খুব শীঘ্রই।

—————

কলেজ ছুটির পর বিষন্ন মুখে বেরিয়ে এলো রূপকথা।নেলি বিভিন্ন কথা বলে রূপকথাকে হ্যাপি করতে চাইলো।কিন্তু রূপকথার মন ভালো হলো না।
ক্লাস শেষ করে রুদ্ররাজ চলে যেতেই ক্লাসের মেয়ে গুলো রুদ্ররাজ আর রূপকথাকে কটাক্ষ করে ঠেস দিয়ে নানান কথা বলেছে

"বুদ্ধির জোর না থাকলেও রূপের জোড়ে ঠিক সুদর্শন ডাক্তারকে নিজের দিকে টেনে নেয়া যায়।

মেয়েদের এমন কুরুচি মন্তব্যে রূপকথা কোনো প্রতিবাদ করেনি ।শুধু দ্রুত পদে ক্লাস ত্যাগ করেছে।নেলিকে নিয়ে বাইরের গেটে আসতেই সারফরাজ কে দেখা গেলো।গাড়ির সামনে ক্রস স্টাইলে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুকছে ।রূপকথাকে দেখতে পেয়েই দ্রুত হাতে সিগারেট ফেলে পায়ে পিষে মুখে হাসির রেখা টেনে এগিয়ে এলো।এরপর শুধালো

"মন ভার কেনো?

রূপকথা সারফরাজ এর দরদ ভরা স্বরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।রূপকথার কান্নায় সারফরাজ শক্ত গলায় শুধালো

"কে কি করেছে?কোনো ছেলে টিজ করেছে?কেউ ফ্রেসার হিসেবে র‍্যাগ দিয়েছে?

সারফরাজ এর উৎকণ্ঠা দেখে নেলি অবাক হলো।সারফরাজ উত্তরের প্রতীক্ষায় রূপকথার হাত চেপে ধরে পুনরায় ভয়ানক গলায় শুধালো

"হু ইজ দ্যাট বাস্টার্ড?

রূপকথা চোখের জল মুছে সারফরাজ এর চোখের পানে তাকালো।রূপকথার অসহায় দৃষ্টি বুঝতে পেরে সারফরাজ বললো

"গাড়িতে এসো।বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি।

রূপকথা সারফরাজ এর পাশের সিটে বসলো আর নেলি ব্যাক সিটে বসে মাথা নিচু করে রইলো।গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট করে সারফরাজ রক্ত হীম করা গলায় বলল

"কে কি বলেছে রূপকথা?জাস্ট টেল মি হিজ নেইম।কতো বড় কলিজা ওয়ালা দেখতে চাই।

রূপকথা সারফরাজ এর পানে তাকিয়ে ভয়ার্ত গলায় বলে উঠলো

"ডক্টর রুদ্ররাজ।

রুদ্ররাজ নাম শুনে সারফরাজ এর চোয়াল কেমন শক্ত হয়ে উঠলো।নীল চোখ জোড়া মুহূর্তেই অগ্নিবর্ন হলো।সেই সাথে ফুলে উঠলো ঘাড় আর কপালের নীল শিরা।
অধিক ক্রোধে নাকের পাতা আর থুতনি কেঁপে উঠলো সারফরাজ এর।মস্তিষ্ক হলো বিক্ষিপ্ত।তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে শুধালো

"কি বলেছে?

রূপকথা একে একে প্রত্যেকটি ঘটনা সারফরাজ কে খোলে বলতেই সারফরাজ ফোন বের করে ডায়াল করলো একটা নম্বরে।ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হতেই সারফরাজ গর্জে উঠা গলায় বলে উঠলো

"লাইট আপ দ্যা ডেভিল কিংস বার ইন ফ্লেম ব্রাউনি।হি ডেয়ার্ড টু মক মাই গার্ল।নাও হি উইল পে ফর ইট।

ওপাশ থেকে ব্রিটিশ একসেন্ট এ ইংরেজি ভাষায় ব্রাউনি কিছু বললো।কিন্তু কানে তুললো না সারফরাজ।সে ধমকে বলে উঠলো

"জাস্ট শাট আপ।আম অলরেডি ডান লিসেনিং।

বলেই ফোন কেটে দিলো সারফরাজ।এরপর সামনের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠলো

"ভুল মানুষের সাথে মজা লুটেছিস তুই রুদ্র।সামান্য হাসির জন্য আমি তোর দুঃস্বপ্ন হয়ে তোকে ধাওয়া করবো।তোর সব গুলো দাঁত একটা একটা করে তুলে নেবো আমি।কতোদিন এভাবে হাসতে পারিস তুই আমিও দেখতে চাই।

—————

ঈদের দিন সকাল থেকেই সারফরাজ কে কসাই রূপে দেখার জন্য রূপকথার মনটা অকুলিবিকুলি করে উঠলো।অবশেষে নিজের মনের কৌতূহল দমাতে না পেরে শিউলি আর আমজাদ হায়দার কে ভুজুং ভাঁজুঙ বুঝিয়ে নেলিকে বগল দাবা করে ছুটলো সারফরাজ এর বাসায়।
রাস্তা ফাঁকা থাকায় বেশি সময় লাগলো না দুজনের।সারফরাজ এর বাড়ির আঙিনায় ঢুকতেই এক কোনে চোখে পড়লো কামাল,নজরুল আর সারফরাজ কে বিশাল এক গরু সমেত।
পাকা কসাই এর মতো শার্ট আর লুঙ্গি পরে রয়েছে সারফরাজ।হাত কুনুই অব্দি গুটানো।পরনের সাদা লুঙ্গিটা কুচিয়ে বাধা।হাতে ধারালো চাপাতি।সাদা লুঙ্গির বেশ খানিকটা রক্তের ছোপ ছোপ দাগে রঙিন হয়েছে।হাতের চাপাতি দিয়ে বেশ দক্ষ হাতে বিশাল গরুর পার্ট বাই পার্ট আলাদা করে কে টে নিচ্ছে সারফরাজ।মন্ত্রমুগ্ধের ন্যয় এই দৃশ্য উপভোগ করলো রূপকথা।সারফরাজ এর হলদেটে ফর্সা চিবুক বেয়ে উষ্ণ ঘর্ম বিন্দু গড়িয়ে পরছে সমানে।লালচে ঠোঁটের উপরেও জমেছে মুক্তা দানার ন্যয় চকচকে ঘাম।সারফরাজ এর চারপাশের বিষয়ে কোনো ধ্যান নেই।আপাতত গরু নিয়েই ব্যস্ত সে।ধীরে ধীরে গরুর বুকে ছাতি ফেড়ে বের করে নিয়ে এলো উষ্ণ টকটকে কলিজা।কলিজা হাতে নিয়ে সারফরাজ এর চোখ দুটো কেমন জ্বলে উঠলো।মনে হলো মানুষের কলিজা বের করে এনেছে সে।
কাজের এক পর্যায়ে সারফরাজ বলে উঠলো

"বিড়ি দাও নজরুল ভাই।গলা শুকিয়ে উঠছে।

লুঙ্গির কোচা থেকে একটা সিগারেট আর লাইটার বের করে এগিয়ে দিলো নজরুল।লুঙ্গিতে হাত মুছে সিগারেট নিয়ে ঠোঁটে ঠেসে আ গুন ধরালো।একটা টান দিয়ে সম্মুখে ধোয়া উড়াতেই রূপকথা আর নেলিকে নজরে পরলো।দ্রুত সেই সিগারেট ঠোঁট থেকে সরিয়ে সারফরাজ সম্মোহনী স্বরে ডাকলো

" রূপকথা!

সম্বিৎ ফিরে পেলো রূপকথা।ধ্যান ছেড়ে বেরিয়ে ঠোঁটে হাসির রেখা টেনে সামনে যেতেই নেলি টেনে ধরে ভয়ার্ত গলায় বললো

"আমি নিশ্চিত সে বিদেশে কসাই গিরি করে।হয় পশুর নয়তো মানুষের।

নেলির অদ্ভুত কথায় রূপকথা কপাল কুঁচকে মুখে চ সূচক শব্দ করে সামনে এগিয়ে গেলো।সারফরাজ চাপাতি ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে দুই হাত মেলে ধরলো।কামালের সামনে রূপকথা সামান্য লজ্জা পেলো।কামাল ঘটনা বুঝতে পেরে নজরুল কে নিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো।রূপকথা দৌড়ে গিয়ে সারফরাজ এর গলা জড়িয়ে ঝুলে গদগদ হয়ে শুধালো

"মানুষের কলিজা এভাবে বের করেছো কখনো?

রূপকথার প্রশ্নে নির্বিকার ভঙ্গিতে রূপকথার চোখের দিকে তাকিয়ে সারফরাজ ঠোঁট টিপে হেসে কপালে কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করে শুধালো

"সাপোজ আই সে ইয়েস,দ্যান হুয়াট?

সারফরাজ এর উত্তরে রূপকথা সারফরাজ এর গলা আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে বলে উঠলো

"দেখতে চাই।

সারফরাজ রক্তাক্ত হাতে রূপকথার গাল স্লাইড করে উত্তর করলো

"সিউর।অ্যাজ ইউ উইশ, মাই কুইন অব দ্যা এম্পায়ার।
·
·
·
চলবে.................................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp