অপরুপ সুন্দরী কাঁপা স্বরে উত্তর দিলো,
“আমার নাম হুসনাত”
উমার অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার শুভ্র কপালে বক্রভাঁজগুলো স্পষ্ট। হুসনাত জবুথুবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার শরীর কাঁপছে কিঞ্চিত। রাজ গ্রন্থগার শুধু সুলতান, শেহজাদা এবং শেহজাদীদের জন্য উন্মুক্ত। এই গ্রন্থাগারে সামান্য দাসের আসার অনুমতি নেই। এখানেই সালতানাতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাচীন বই আছে। কিছু বইয়ে মেহমুদ বংশের কিছু গোপনীয়তাও লুকায়িত। মালেক শাহ বই পড়ার বিষয়ে বড্ড উদাসীন। কিন্তু উমার ছোট বেলা থেকেই সাহিত্য এবং শিল্পের অনুরাগী। তাই কোনো শেহজাদা এখানে না আসলেও উমারের বিচরণ এই গ্রন্থাগারে সর্বদা। গ্রন্থাগারে থাকাকালীন সে কারোর উপস্থিতি পছন্দ করে না। এই কারণে গম্ভীর স্বরে শুধালো,
“কে তুমি?”
“আমি শেহজাদী রুমেলিয়ার দাসী। ভুলক্রমে এখানে চলে এসেছি হুজুর। ক্ষমা করবেন”
উমার সন্দিহান স্বরে শুধালো,
“ভুলক্রমে?”
“হুজুর, এই প্রাসাদে আমি নতুন। মাঝে মাঝেই পথ ভুলে যাই। এখন আমি শেহজাদীর জন্য তাজা ফুল নিতে এসেছিলাম”
“বাগান তো দক্ষিণে”
“আমি বুঝতে পারি নি হুজুর, ক্ষমা করে দিন”
উমারের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। সে উপহাসের ভঙ্গিতে হেসে বললো,
“তুমি ইচ্ছে করে এখানে আসো নি, তাহলে তোমার হাতে “বুস্তান” বইটি ছিলো কেন?”
হুসনাতের মুখখানা রক্তশূন্য হয়ে গেলো। সে তো বইটা নেড়ে চেড়ে দেখছিলো মাত্র। শেহজাদা কি সেটা দেখে ফেলেছেন? উমার তার ভয়ার্ত মুখখানা দেখে সামান্য নরম করলো কণ্ঠ। তারপর শুধালো,
“তুমি পড়তে জানো?”
সাথে সাথেই তাকে অবাক করে হুসনাত হাটুভেঙ্গে তার নিকট মাথা নত করে বললো,
“ক্ষমা করে দিন হুজুর, এই দাসি অন্যায় করে ফেলেছে। আমাকে দয়া করে মৃত্যুদন্ড দিবেন না। আমি এই ভুল দ্বিতীয়বার করবো না হুজুর”
মেহমুদ সাম্রাজ্যের সামান্য দাসী লেখাপড়া জানে ব্যাপারটা অস্বাভাবিক। হুসনাত নামক মেয়েটি জন্মগত দাসী। সুতরাং তার পক্ষে লেখাপড়া অসম্ভব। কিন্তু মেয়েটিকে এতো ভয় পেয়ে যেতে দেখে একটু বিচলিত হলো উমার। সে কখনো সামান্য কারণে কাউকে শাস্তি দেবার পক্ষপাতী নয়। সুতরাং মেয়েটি ভুল করে গ্রন্থাগারে এসে একটি বই হাতে নিয়েছে ব্যাপারখানা অন্তত উমারের কাছে গর্হিত অপরাধ নয়। যার কারণে সে তাকে মৃত্যুদন্ড কখনোই দিবে না। উমারের কণ্ঠ আরোও নরম হলো। খুব শান্ত স্বরে বললো,
“তুমি এতোটা ভয় পাচ্ছো কেন?”
হুসনাত চোখ তুলে চাইলো। তার চোখগুলোতে ভয়ের রেখা স্পষ্ট। কেমন অসহায় খাবি খাওয়া চাহনি। উমার শান্ত গলায় বললো,
“তোমার কেন মনে হল আমি তোমাকে মৃত্যুদন্ড দিব?”
হুসনাত উত্তর দিলো না। মাথানত করে বসে রইলো। উমার তার নীরবতাকে যেন পড়তে পারলো। পরক্ষণে হেসে বললো,
“পড়ালেখা জানা কোনো অপরাধ নয়”
“আমাকে ক্ষমা করবেন হুজুর”
উমার বুঝলো মেয়েটি কোনোমতে এখান থেকে বাঁচতে চাইছে। তাই সে “বুস্তান” বইটা হুসনাতের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
“তুমি এখন যাও, রুমেলিয়া অপেক্ষা করছে। আর এই বইটা তুমি নিয়ে যাও। পড়তে চাইলে পড়তে পারো”
হুসনাত দ্বিধা নিয়ে চাইলো। সে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না, উমার তাকে বইখানা দিচ্ছে। হুসনাত বেকুবের মত শুধালো,
“বইটা ফেরত দিব কি করে?”
“তোমার কাছেই রেখো। আমার পক্ষ থেকে উপহার। তবে তুমি কিন্তু আমাকে বললে না তুমি পড়তে শিখেছো কি করে?”
হুসনাত কিছু সময় চুপ থেকে অসহায় স্বরে উত্তর দেয়,
“আমার আগের মনিব আমাকে শিখিয়েছেন। উনি তো হাকেম ছিলেন তাই”
উমার আর কোনো প্রশ্ন করলো না। মৃদু স্বরে বলল,
“যাও”
হুসনাত বইটা নিয়ে বেরিয়ে গেলো গ্রন্থাগার থেকে। দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। ভাগ্যিস শেহজাদা উমারই ছিলেন। অন্যকেউ হলে গর্দান চলে যেত।
—————
তাবিয়ার ঘরের জানালার খিলানগুলো খোলা। তাবিয়া দাঁড়িয়ে আছে জানালার কাছে। খোলা আকাশ দেখতে তার ভালো লাগে। মরু আকাশে কালো মেঘ দেখা যায় না। মেঘহীন স্বচ্ছ আকাশটাকে আরোও নীল এবং গভীর লাগছে। রোকসানা জানালো,
“মালেকা, হুসনাত এসেছে”
হুসনাত এসেই কুর্নিশ করলো। তাবিয়া শুধালো,
“কি খবর?”
“গতরাতে আমি যখন শেহজাদার কামড়ায় গিয়েছিলাম, তখন হুদ এবং শেহজাদা কিছু নিয়ে কথা বলছিলেন। একজনের বার্তা এসেছে। সেই বার্তা দেখে শেহজাদা অত্যন্ত আনন্দিত ছিলেন”
“বার্তাটা কিসের?”
“ক্ষমা করবেন সুলতানা, আমি পড়তে পারি না। তবে আমি বার্তাটা শেহজাদার দৃষ্টির অলক্ষে নিয়ে এসেছি”
বলেই তাবিয়ার সামনে চিঠিখানা রাখলো সে। চিঠিটি বায়োজিদের। চিঠিতে সে আলাউদ্দিনের পলানো এবং ওখানের অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়টা স্পষ্ট করে উল্লেখ করে। চিঠিটি পড়তেই তাবিয়ার মুখ শক্ত হয়ে গেলো। আলাউদ্দিন পালিয়ে মানে এসফাইন এখন তার বাবা আবদালীর নিয়ন্ত্রণে নেই। তাবিয়া কুণ্ঠা নিয়ে শুধালো,
“এই চিঠি কখন এসেছে?”
“গতকাল রাতে মালেকা”
“শেহজাদা টের পায় নি তো?”
“জি না মালেকা, উনি টের পান নি”
“আচ্ছা যাও”
তাবিয়া তাকে যেতে বলতেই হুসনাত দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এলো। ফোঁস করে একটি নিঃশ্বাস ফেললো। এই চিঠিটা ইরহান নিজ হাতে হুসনাতকে দিয়েছিলো। তাবিয়া হুসনাতকে যেন ভরসা করে সেটাই ছিলো উদ্দেশ্য। হুসনাত জানে না কতদিন এই দুজনের মধ্যে তাকে জীবনের মায়ায় সাপলুডুর গুটি হয়ে থাকতে হবে।
!!১৫!!
কমলা সূর্যটি পশ্চিমে অস্ত গিয়ে ধরণীতে নেমে এসেছে আঁধার। সেই আঁধারে মরুভূমির তপ্ত মাটি শীতল হয়ে গেছে। আদ্রতা এবং মেঘের অভাবে তারাখচিত আকাশটা নিজের সমগ্র সৌন্দর্য্য নিয়ে নিজেকে উন্মোচিত করেছেন। পাতাল ঘরে তখন আর্তনাদ। বণিক নিজের শারীরিক কষ্টকে সইতে পারছে না। ক্ষিধা, তৃষ্ণায় তার প্রাণটুকু শুধু একটুর জন্য আটকে আছে। শরীরের ক্ষতগুলোকে চিকিৎসা করিয়ে পুণরায় সেই নির্যাতন। হাতের আঙ্গুলের নখ উপড়ে ফেলেছে। যন্ত্রণায় কাঁতরাতে কাঁতরাতে যখন আর পারছিলো না, তখন অনুরোধ করলো,
“আমাকে মৃত্যু দাও”
কিন্তু ইরহানের মনটায় মায়া নেই। মায়া শব্দটিকে সে অপছন্দ করে। তাই কোনোপ্রকার দয়া না দেখিয়ে বললো,
“মালিকের নাম বল, এখনই তোকে মুক্ত করে দিচ্ছি”
বণিক জানে, এই মুক্তি চিরমুক্তি। সে পরিহাসের হাসি হেসে বলে,
“আমার কোনো মালিক নেই, আমি স্বাধীন”
ইরহানের দৃষ্টি ধাঁরালো হয়। বণিকের ক্ষত আঙ্গুলে একটা জ্বলন্ত শলাকা চেঁপে ধরে ক্রুদ্ধ স্বরে বললো,
“মৃত্যুর তুলনায় জীবনের বিষ তোর স্বাধীনতাকে একটু একটু করে নিঃশেষ করে দেয়। আমি তোকে সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা দিচ্ছি। মৃত্যু। মৃত্যুর আগ অবধি তুই আমার বন্দি”
বণিক যন্ত্রণা চিৎকার করে উঠে। তার বেদনাতুর আর্তনাদ পাতালঘরের দেওয়ালকেও ভীত করে তুললো। হুদ মুখ বিকৃত করে অন্যদিকে চেয়ে রয়। বণিক চিৎকার করে বলে,
“এই ক—কষ্ট আল্লাহ তোকে হা-জার--গুণেএ ফিরিয়ে দিবে। এই সাম্রাজ্যের ধ্বংস নিশ্চিত। যেভাবে তোরা একদিন খোর—তাই—ন--দের শির--শ্ছেদ করে--ছিলি। তো--দেরও হবেএএএ”
ইরহানের ভাবাবেগ হলো না। তার সাদা কাফতান রক্তে রঞ্জিত। বেরিয়ে যাবার পূর্বে হুদকে শুধালো,
“খোরতাইনদের কেউ কি জীবিত আছে?”
“না হুজুর, শেহজাদা নাসিরকে আগুণে পুড়িয়ে মারা হয়েছে”
—————
হারেমের প্রতিটি প্রাণ যখন ঘুমে তখন হুসনাত নিশাচরের মত ধীর পায়ে শেহজাদা ইরহানের ঘরে গেলো। এটাই যেন নিয়ম। আয়েশা মজা করে শুধায়,
“তুমি কি শেহজাদার প্রেমে পড়লে?”
প্রেম, হ্যা একপ্রকার শারীরিক প্রেমই বটে। দেহের চাহিদা। ইরহান তার সকল আক্রোশ উগড়ে দেয় তার ছোট দেহে। সে এই আক্রোশের স্মৃতিগুলো নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে সকাল হতেই সকলের দৃষ্টির অগোচরে বেরিয়ে যায়। যন্ত্রণা, দাগগুলোকে সহ্য করে নেয়। নরকীয় যন্ত্রণা মনে হয় মাঝে মাঝে ইরহানের স্পর্শ। কিন্তু বেঁচে থাকার কাছে এই নরকীয় যন্ত্রণা কিছুই নয়। ইরহানকে ভালোবাসা কিংবা তার প্রেমে পড়াটা খুব অলীক কল্পনা লাগে। হুসনাত লোভী হতে চায় না। সে শুধু বাঁচতে চায়। এই পৃথিবীর নিষ্ঠুরতাকে দিনের পর দিন সইতে সইতে এখন পৃথিবীর প্রতি কেবল ঘৃণাই আসে। শেহজাদার ঘরের বাহিরে আজ হুদ নেই। হুসনাত ভেতরে প্রবেশ করতেই রক্তের তীক্ষ্ণ গন্ধ নাকে আসলো। রক্ত রঞ্জিত কাফতানটা মাটিতে পড়ে আছে। ইরহান নিঃশব্দ আগমণ টের পেলো না। সাদা একখানা থান জড়িয়ে রাখলো শরীরের নিচের ভাগে। তার পিঠ নগ্ন। মশালের হলদেটে রঙ্গে সেই পিঠ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তার উপর জমে আছে ঘাম। হুসনাত দৃষ্টি নামিয়ে বললো,
“আমি কি চলে যাব হুজুর?”
ইরহান পেছনে চাইলো। তার চেহারায় এখনো রক্তের দাগ। সে হাত বাড়িয়ে ইশারা করলো হুসনাতকে। হুসনাত কাছে আসতেই তার গালে রুক্ষ্ণ আঙ্গুল বুলিয়ে বললো,
“তুমি সুলতানাকে চিঠিটা দিয়েছো?”
“জি হুজুর”
“তুমি খুব বুদ্ধিমতী এবং অনুগত দাসী। তোমার এই চমৎকার গুণের জন্য তোমার পুরষ্কার প্রাপ্ত”
বলেই তার নগ্ন তলোয়ারটা চেপে ধরলো হুসনাতের গলায়। হিনহিনে স্বরে বললো,
“আমি আগে বলেছিলাম আমার বিশ্বাসঘাতক পছন্দ নয়”
বলেই নির্দয় ভাবে তলোয়ারখানা চালিয়ে দিলো।
·
·
·
চলবে...................................................................................