বাসায় ফিরেই নিহিন দেখল মোহনা এসে বসে আছে। নিহিনকে দেখামাত্রই বলল,
“তোর সমস্যাটা কী বলতো?”
“কেন কী হয়েছে?”
“সেদিন ছেলেটার ছবি পাঠালাম, কিছুই জানালি না। ভালো বা খারাপ কিছু তো একটা জানায় মানুষ। এমনকি আমার একটা মেসেজের রিপ্লাই পর্যন্ত দিসনি। এতবার ফোন করলাম তাও ধরিসনি।”
“আপু প্লিজ, এরকম করো না। আমি সেদিন অনেক ব্যস্ত ছিলাম। আর আমার এসব ছেলে-ফেলে দেখতে কোনো ইন্টারেস্ট নেই।”
বলে নিহিন নিজের ঘরে ঢুকে গেল। মোহনা পিছনে পিছনে গেল।
“তা থাকবে কেন? যাই হোক, না থাকলে নাই, নিজের পছন্দ থাকলে সেটা অন্তত বল। বাবাকে এ বয়সেই আর কত টেনশন দিবি?”
“আমি কোথায় টেনশন দিচ্ছি?”
“মেয়েকে বিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত বাবার টেনশন যায়?”
“আরে ভাই বিয়ে করব না তাতো একবারও বলিনি। ইচ্ছে করলেই তো বিয়ে করে ফেলা যায় না। কাউকে পছন্দ না হলে কাকে বিয়ে করব? এখন তো আর সে বয়স নেই যে তোমরা একজনকে ধরে নিয়ে আসবে চোখ বুজে তাকে গ্রহণ করব।”
এ কথায় মিইয়ে গেল মোহনা, তবু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। নিহিন ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“আপু প্লিজ এ ব্যাপারটা নিয়ে আর একটা কথাও বলতে চাচ্ছি না।” আমার অনেক কাজ আছে। তুমি এখন যাও প্লিজ, দুলাভাই বসে আছে তোমার জন্য। অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে। পরে তোমাদের বাসায় ফিরতে দেরি হয়ে যাবে।”
আপু রাগ করে চলে গেল। দরজাটা লাগিয়ে দিয়েই শুয়ে পড়ল নিহিন। ফ্রেশও হলো না। আজ কলরবের সাথে দেখা হয়েছে, এরচেয়ে বেশি
রিফ্রেশমেন্ট আর কী হতে পারে! কলরবের কথাগুলো বারবার মনে করে করে শুনছে, দেখা হওয়া থেকে শুরু করে পৌঁছে দিয়ে বিদায় নেয়া পর্যন্ত রিভাইস করছে ও, একবার নয় বারবার। আগের মতই কলরবই বেশি কথা বলেছে আর ও শুনেছে। এর মধ্যেও যে কি অনাবিল আনন্দ তা নিহিন কাউকে বোঝাতে পারবে না। খুব ভালো লাগছে, খুব। সময়টাকে আটকে দিতে ইচ্ছে করছে, এত ভালো সময় যদি আর কোনোদিন না আসে!
নিহিনকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে যখন কলরব বাসায় ফিরছিল মনে হচ্ছিল অনেক কিছু পেল ও। এ পাঁচ ছয় ঘণ্টা নিহিন বসে ছিল ওর সামনে, আর ও মুগ্ধ চোখে দেখছিল। কত রাত নিহিন জানালার পাশে কাটিয়েছে কলরবের সামনে বসে, হাত ধরে কাটিয়েছে।
তখনও মুগ্ধ চোখে দেখত ও। কিন্তু সে পাওয়ার চেয়ে এ পাওয়া কেন বেশি বলে মনে হচ্ছে? বারবার কলরবের চোখের সামনে ভেসে উঠছে নিহিনের সে হাসিটা, সে তিলটা আর চোখের সামনে থেকে চুল সরিয়ে কানের পাশে গুঁজে দেওয়াটা।
বাসায় ফিরতে রাত হওয়ায় এসেই ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়েছে কল্প। তারও অনেক পরে কলরব শুতে এলো। বিছানায় শোয়ামাত্র কল্প পাশ ফিরে বলল,
“পাপ্পা…”
“ওরে দুষ্টুটা, এখনো ঘুমাসনি?”
“একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
“অবশ্যই বাবা।”
“আন্টিটার সাথে কি আমার ছোটবেলায় দেখা হয়েছিল?”
“হ্যাঁ, এখনই তো তোর ছোটবেলা।”
হেসে বলল কলরব। কল্প খুব সিরিয়াস গলায় বলল,
“উফ আমি বলছি আগের ছোটবেলায়ও কি দেখা হয়েছিল?”
“না।”
“তাহলে এত চিনি কেন?”
“চিনি কেন না, চেনা চেনা লাগছে কেন হবে।”
“উফ বলো না পাপ্পা।”
কল্প আরো সিরিয়াস। কলরব বলল,
“জানি না বাবা, হয়তো তোদের স্কুলে ওর মতো কোনো মিস্ ছিল “উঁহু, অনেকটা মায়ের মতো দেখতে।”
কলরবের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। যে ভয়টা পাচ্ছিল তাই হলো।
“দূর পাগল তোর মায়ের মতো লাগবে কোত্থেকে? সবসময় মাকে মিস করিস তো তাই এরকম মনে হচ্ছে।”
হঠাৎ কলরবকে অবাক করে দিয়ে কল্প ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল। কাঁদতে কাঁদতেই বলছিল,
“আমার খুব মার কাছে যেতে ইচ্ছে করে পাপ্পা, মায়ের বুকে ঘুমাতে ইচ্ছে করে। সবার মা আছে, শুধু আমার নেই।”
কলরব কল্পকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বলল,
“কাঁদে না বাবা, তুই না আমার লক্ষ্মী ছেলে। তুই না সব বুঝিস? কাঁদে না, কাঁদলে মা কষ্ট পাবে তো।”
কল্পর কান্না আরো বাড়ল। কলরব কল্পকে জড়িয়ে ধরে চুপ করে বসে রইল। হঠাৎ খেয়াল হলো ফেরার পথে পুরো রাস্তা চুপ ছিল কল্প। নিহিনের কথা চিন্তা করতে করতে ব্যাপারটা খেয়ালই করেনি কলরব। দূর, এই প্রথম ছেলেটার কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল, খেয়ালই করেনি কল্প কী করছিল, কী ভাবছিল। এমনটা কেন হলো? ও কি তাহলে ভুল করতে যাচ্ছে? সামনে আগানোর আগে ব্যাপারটা নিয়ে আরো ভালো করে ভাবতে হবে।
·
·
·
চলবে....................................................................................