দাসরাজ্ঞী - পর্ব ১৩ - মুশফিকা রহমান মৈথি - ধারাবাহিক গল্প


          হুসনাতের জ্বর ভোরে আবার এলো। অচেতন হয়ে পড়ে রইলো সে গোটা দু দিন। এর মধ্যে এক অদ্ভুত কান্ড ঘটেছে। পাতালঘরে বণিক মারা গেছে। কিন্তু তার মৃত্যুটা হয়েছে একেবারে স্বাভাবিকভাবে। পাতালঘরে তার লাশ প্রথমে রুস্তম আবিষ্কার করে। ইরহানের ছায়াসৈন্যদলের প্রধান রুস্তম এবং হুদ ব্যতীত কারোর পাতালঘরে প্রবেশের অনুমতি নেই। রুস্তম যথারীতি খাবার নিয়ে গিয়েছিলো পাতালঘরে। ইরহানের কড়া হুকুম,
 “কিছুতেই যেন বণিক না মরে”

অথচ যখন সে পাতালঘরের কক্ষে প্রবেশ করলো তখন বণিক মৃত। শিকলে বাঁধা তার নিষ্প্রাণ দেহটা পড়েছিলো। মুখখানা হা হয়ে ছিলো। চোখজোড়া খোলা। মুখে কোনো গ্যাঁজা বা ফেনা ছিলো না। প্রথমে রুস্তম ভেবেছিলো বণিক মরে নি। কারণ তার এবং মৃত দেহের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। কংকালসার দেহ, খুবলে আসা মাংস, কবজি বিহীন হাত—এমন দেহকে জীবিত কেউ বলবে না। ইঁদুর কাঁমড়াচ্ছে, মাছি ভনভন করছে অথচ কোনো বিকার নেই। সুতরাং প্রথমে আমলে না নিলেও যখন তাকে ধাক্কা দিলো, তখন নিথর দেহটা লুটিয়ে পড়লো। রুস্তম দেরি না করেই হুদকে খবর দিলো। হুদ হাকেম নিয়ে উপস্থিত হলো নিশ্চিত হলে। হাকেম নারী পরীক্ষা করে জানালো,
 “সে মারা গেছে। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নইলাহি রাজিউন”

হাকেম মৃত্যুর কারণ হিসেবে স্বাভাবিক মৃত্যু ঘোষণা করলেও হুদের কাছে ব্যপারটা কেমন ধোঁয়াশা লাগছে। তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিলো যেন কোনোভাবেই তার মৃত্যু না হয়। বণিকের পেছনের আসল মানুষটিকে কে তার সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায় নি। বণিকের আসল নামটি অবধি জানা যায় নি। অবশ্য হুদ তার একটি চিত্র বানিয়ে বায়োজিদকে পাঠিয়েছে। বায়োজিদ এখন এসফাইনেই রয়েছে। সে হয়তো এই বণিকের পরিচয় বের করতে পারবে। বণিকের মৃত্যু সংবাদ ইরহানকে জানালে, ইরহান খুব স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখালো। হুদ মৃত্যুটি নিয়ে যত আগ্রহ দেখানোর চেষ্টা করলো সে ততই অনাগ্রহ প্রকাশ করলো ইরহান। বণিকের মৃত্যু সংবাদ শুনে সে কেবল একটাই কথা বললো,
 “কেউ যেন ওর লাশ খুঁজে না পায়”

*****

নিকষ কৃষ্ণ একটি ঘর। নিস্তব্ধতা বিরাজমান সর্বত্র। কোনো আলো নেই, কোনো শব্দ নেই। এক অদ্ভূত, অচেনা জায়গা। হুসনাত কিছু দেখতে পারছে না। তার শরীরখানা একেবারে হালকা হয়ে আছে। একেবারে তুলোর মত। হাটতে হচ্ছে না তাকে, মনে হচ্ছে বাতাস তাকে উড়িয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে। হুসনাতের কেমন ভয় ভয় করছে। সে একবার ডাকলো,
 “মা? মা?”

কিন্তু কোনো সাড়া পেলো না। তখন তার স্মরণ হলো তার পরিবারের কেউ নেই। আচ্ছা কেন তার পরিবারের কেউ নেই? হুসনাত ঠিক মনে করতে পারলো না। স্মৃতিরা কেমন আবছা। অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না। সে কোথায় আছে? সে কি মারা গেছে? তার শরীরটা কোথায়? হঠাৎ স্মরণ হলো সে পাতালঘরে ছিলো। তাকে কামড়ে, ছোরাঘাতে ক্ষতবিক্ষত করছিলো অপ্রকৃতস্থ বণিক। ইরহান তাকে দয়া করে নি। অথচ এমনটা হবার কথা ছিলো না। সে বণিকের লোক নয়, বণিকের কোনো পরিকল্পনার অংশ সে নয়। সে তো একটা সাধারণ জীবনের খোঁজে এসেছিলো এই মহলে। সেদিন মালেক শাহর কাছে নিজেকে সপে দিলে কি তার জীবনটা ভিন্ন হত? কেন বিশ্বাস করলো সে ইরহানকে? না, ভুল হুসনাত কখনো বিশ্বাস করে নি ইরহানকে। সে শুধু তার ছত্রছায়ায় থাকতে চেয়েছে। ইরহানের মতো ক্রুর মানুষের থেকে সে কোনো কিছু আশা করে নি। নাকি করেছিলো? যেকারণে তার এতোটা নিষ্ঠুরতা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। 

হুসনাতের শরীরটা কি এখনো পাতাল ঘরেই পড়ে আছে? সেটাকে ইঁদুর, পোকা খুবলে খাচ্ছে? ইরহান কি একটিবারও তাকে দেখতে এসেছিলো? হয়তো না। হুসনাত দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তার স্মৃতিগুলো কেমন ঘোলাটে হয়ে আসছে। আয়েশা হয়তো তাকে খুঁজছে। মেয়েটি খুব ভালো। মেয়েটিকে বলা হয় নি, হুসনাত তার জন্য রান্নাঘর থেকে মিষ্টি চুরি করেছে। মিষ্টি পেলে মেয়েটি খুব খুশি হয়ে যায়। কিন্তু সেটা হয়তো আয়েশাকে দেওয়া হবে না। আচ্ছা শেহজাদী কি তাকে খুঁজবে? মালেকা তাবিয়া? তিনি কি খুঁজবেন? বাস্তবতা হলো কেউ তাকে খুঁজবে না। খোঁজার কথাও না। হঠাৎ হুসনাতের মনে হলো তার চারপাশের জায়গাটা কেমন ছোট হয়ে যাচ্ছে। চারটে দেওয়াল যেন তার দিকে এগিয়ে আসছে। এখনি তাকে মিশিয়ে ফেলবে। এখান থেকে প্রস্থান করতে হবে হুসনাতের। কিন্তু তার পা ভারী হয়ে আসছে। এগোতে পারছে না। সামনে ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্ছে। হুসনাত সেই আলোর কাছে গেলে কি নিজেকে মুক্ত করতে পারবে? হয়তো! কিন্তু পা যে এগোচ্ছে না। এদিকে দেওয়ালগুলো ক্রমশ এগিয়ে আসছে। হুসনাত ছুটছে। সে এই ঘর থেকে বেরিয়ে আলোর কাছে যেতে চাইছে। সে নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ছুটছে। একটা সময় আলোটা কাছে এগিয়ে এলো। এই আলোর পরের পথটা কি স্বর্গ? সে পাপী আত্মা। স্বর্গে তার ঠাঁই নেই। তাহলে সে কোথায় যাচ্ছে। আলোর খুব কাছে আসতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেলো হুসনাতের। তাকাতে পারলো না আর। তারপর সবকিছু যেন সাদা হয়ে গেলো। প্রায় সাথে সাথেই চোখ মেললো হুসনাত। সারা দেহ ঘামে জবজব করছে। মাথার উপরের আলপনা খচিত ছাঁদ দেখে সে ধাতস্থ হতে পারলো না, সে কি মরে নি? তখন ক্ষীণ নারী স্বর কানে এলো,
 “এখন কেমন লাগছে মা?”

হুসনাত পাশে তাকালো। এক বৃদ্ধা তার পাশে বসে আছে। হুসনাত বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। মহিলাটি বললো,
 “শরীরের ব্যথা কি এখনো তীব্র?”

হ্যা, শরীরে তীব্র ব্যথা হচ্ছে। এই ব্যথার অনুভূতি পার্থিব। তার নাকে পার্থিব গন্ধ আসছে। সে বেঁচে আছে। সে মরে নি। হুসনাতের মাথাখানা ভার হয়ে আছে। বুকের মধ্যিখানে কি যেন উথলে উঠছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে যেন। মহিলা তার মাথাখানা একটু তুলে একটু পানি খাওয়ালো। গলাটা শুকিয়ে আসছিলো। হুসনাত জড়ানো স্বরে বললো,
 “আমি কি বেঁচে আছি”

মহিলা হাসলো। যার অর্থ হ্যা। হুসনাতের মনে হলো বুকের উপর থেকে কিছু একটা নেমে গেছে। সে বেঁচে আছে। তার খুব আনন্দ লাগছে। তার শুষ্ক ঠোঁটে হাসি ছড়িয়ে গেলো। সে মরে নি। সে সত্যি মরে নি। 

****

আলাউদ্দিনের শাস্তির প্রস্তাবটা দরবারের সকলের সম্মুখেই দিলো আবু সাঈদ। মালেক শাহ তার প্রস্তাবে অবাক হলো। সে প্রথমে উজির প্রধান আবদালীর দিকে চাইলো। আবদালী নিজেও আবু সাঈদের প্রস্তাবের জন্য প্রস্তুত ছিলো না। মালেক শাহ তাকে স্বাভাবিক স্বরে শুধালো,
 “তোমার সত্যি মনে হয় আলাউদ্দিনকে সুযোগ দেওয়া অন্যায় হবে?”
 “জি জাহাপনা। আলাউদ্দিনকে যদি শাস্তি না দেওয়া হয় তবে আমাদের অধীনের রাজ্যগুলো আমাদের পেয়ে বসবে। তারাও আমাদের অবাধ্য হতে চাইবে। আলাউদ্দিনের কাটা মাথা যদি নগরের প্রবেশদ্বারে ঝুলানো যায় তবে সেই খবর ছড়িয়ে পড়বে সর্বত্র। প্রজাদের কাছেও আমাদের জনপ্রিয়তা বাড়বে। অন্যান্য প্রাদেশিক প্রধানও সুলতানকে ভয় পাবে”

আবু সাঈদের যুক্তি খণ্ডন করলো শেহজাদা উমার। তার হিংস্রতা পছন্দ নয়। তাই সে বিনয়ী স্বরে বললো,
 “কিন্তু জাহাপনা, এতোটা কঠিন শাস্তি কি হিতে বিপরীত প্রতিক্রিয়া ফেলবে না? মানুষ আমাদেরকে বর্বর ভাবতে পারে। হ্যা আলাউদ্দিনের কাজ ক্ষমার অযোগ্য। তবে সেও আমাদের আনুগত্য। তার সাহায্যতে খোরতাইনদের আমরা পরাজিত করেছি। তার এই কৃতীত্ব ভুলে গেলে হবে না। ক্ষমতা মানুষকে লোভী করে তুলে। আলাউদ্দিনের ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটেছে। তাকে কারাদন্ড বা চাবুকের আঘাত দেওয়াটাই শ্রেয় মনে হচ্ছে। মৃত্যুদন্ড খুব কঠিন শাস্তি হয়ে যাবে”

আবু সাঈদ প্রায় সাথে সাথেই বলে উঠলো, 
“ভাইজানের মন অনেক নরম। কিন্তু সুলতানদের একই সাথে কঠোর এবং কোমল হতে হয়। ভুলে গেলে চলবে না আলাউদ্দিন নিজেকে সুলতান ঘোষণা করেছিলো। যা গর্হিত গুনাহ। তাই সামান্য কারাদন্ড তার শাস্তি হতে পারে না। জাহাপনা আদেশ দিলে আমি নিজে আলাউদ্দিনকে খুঁজে শাস্তির ব্যবস্থা করবো”

উজির প্রধানের মুখখানা কালো হয়ে গেলো। চিন্তার বলিরেখা দেখা গেলো তার কপালে। সে নিজের নাতনীর বিরোধিতা করতে চাইছে না। কিন্তু আলাউদ্দিন তার খাস লোক। সে কিছু বলতে যাবে তার পূর্বেই মালেক শাহ ঘোষণা করলো,
 “বেশ, যদি তুমি পনেরো দিনের মধ্যে ওকে খুঁজে তার গর্দান প্রধান প্রবেশদ্বারে ঝুলাতে পারো তবে আমি তোমার যেকোনো ইচ্ছে পূরণ করবো”

সুলতানের এমন আদেশে উমার অখুশি হলেও সে কিছু বললো না। সুলতান উমারকে বলল,
 “শেহজাদা উমার, তুমি আমার সাথে একমত পোষণ কর নি?” 
 “না জাহাপনা, আমি এমন ধৃষ্টতা দেখাতে পারি না। আপনি যা সিদ্ধান্ত নিবেন, রাজ্যের হিতের জন্যই নিবেন”

সভার মধ্যে মীর বখসির নজর ছিলো আবদালীর উপর। সে খুব ধীর কণ্ঠে বলল,
 “উজির প্রধান কি চিন্তিত? আপনার তো খুশি হবার কথা। শেহজাদা এতটা বিচক্ষণ প্রস্তাব রেখেছে দরবারে”
  “আপনি ভুল ভাবছেন সেনাপ্রধান। আমি অত্যন্ত খুশি”

বলেই হনহন করে বের হয়ে গেলেন উজির প্রধান। দরবার ছাড়তেই সে সরাসরি খবর পাঠালেন সুলতানা তাবিয়ার কাছে। দাসকে দিয়ে জানালেন,
 “তোমার সাথে গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে”

*******

হুসনাতের সম্মুখে তামার থালায় রাজকীয় খাবার পরিবেশন করা হয়েছে। সে দ্বিধান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে খাবারের দিকে। এই মহলে দাসীদের খাবার হয় অতিসাধারণ। খুব আনন্দের কোনো সংবাদ ছাড়া মিষ্টান্ন বা বিরিয়ানি তাদের নসিবে জুটে না। অথচ তার সম্মুখে একটি আস্ত ভেড়ার পা রাখা আছে। ইরহান খেতে বসেছে। হুসনাতকে বিভ্রান্ত দেখে সে শুধালো,
 "বিসমিল্লাহ করো!"
 "এতো খাবার?"
 "তোমার জন্য আনানো হয়েছে"

ইরহানের এমন কথায় বিহ্বলতা আকাশ ছুঁলো হুসনাতের। সে ভীত চোখে তাকালো ইরহানের দিকে। ইরহান বক্রহাসি ঠোঁটে লেপ্টে উত্তর দিলো,
 "নিজের মানুষদের যত্ন কি করে নিতে হয় এই ইরহান আলী শাহ ভালো করেই জানে! তুমি তো আমার খাস মানুষ।"

হুসনাত কি সঠিক শুনছে? ইরহান তাকে খাস মানুষ বললো? অথচ এই মানুষটির জন্য সে মৃত্যুকে এতোটা কাছ থেকে দেখেছিলো সেদিন। হুসনাত আমতা আমতা করে বললো,
 “গোস্তাকি মাফ করবেন হুজুর। কিন্তু এই নাদান কিছু বুঝতে পারছে না”
 
ইরহানের হাসি চওড়া হলো। সে মাংসের একদলা ছিড়ে হুসনাতের মুখের কাছে ধরলো। হুসনাত অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে আছে। লোকটির দৃষ্টির ধার আজ নেই। বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা মানুষকে যেন দেখছে সে। হুসনাতকে নিজের দিকে বেকুবের মত চেয়ে থাকতে দেখে ইরহান অধৈর্য্য গলায় বললো,
 “হাত ব্যথা করছে, খাও”

হুসনাত মাংসটুকু গালে দিলো। কিন্তু গলা দিয়ে নামাতে পারছে না। ইরহান নিজের খাওয়ায় মনোযোগী হলো। খেতে খেতে একটা সময় বললো,
 “আকাশ পাতাল ভাবনা থামাও। আমার মন বদলেছে। উদার দিল আমার, তাই ক্ষমা করে দিয়েছি”

হুসনাতের কেন যেন মনে হচ্ছে কথাটা সত্য নয়। উদারতার জন্য তাকে ক্ষমা করা হয় নি। এর কারণটা ভিন্ন। তার অনুমান সত্যি হলো যখন ইরহান তার দিকে একটি পত্র এগিয়ে বললো,
 “আমার ধারণা অতিসত্ত্বর উজির তার সাথে মোলাকাত করবেন। তাই তোমাকে তিনি ডাকবেন, প্রস্তুত থেকো”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp