নিহিন খুঁজে পেল কলরবকে। যে এতদিনে অন্য কারো হয়ে গেছে। কি দরকার ছিল এতকিছু ঘটার! ভালোই তো ছিল। কেনই বা বাবা এতদিন পর সবকিছু বলতে গেল, আর কেনোইবা ও হন্যে হয়ে খুঁজতে গেল! কিংবা খুঁজে না পেলেও একদিক দিয়ে ভালো হতো, অনন্তকাল ধরে চলত এ খোঁজাখুঁজি, বেশ হতো। খুঁজে পাওয়ার অপেক্ষার মাঝেও এক ধরনের ভালোলাগা ছিল। কিন্তু আজ তো সবটাই শেষ হয়ে গেল। পাঁচ বছরের একটা ছেলে আছে ওর। তার মানে নিহিনের বাবার কাছে যখন শুনেছে ওর বিয়ে ঠিক হয়েছে তার পর ও বিয়ে করেছে। ৪ টা বছর কোনো কথা না বলে, কোনো সাপোর্ট না পেয়েও অপেক্ষা করেছে কলরব। বিয়ে করার জন্য নিজেকে তৈরি করেছে। কতটা ভালোবাসলে একটা মানুষ এটা পারে তাই ভেবে অবাক হচ্ছে নিহিন! আর কষ্ট পাচ্ছে সে ভালোবাসার মানুষটা আজ হারিয়ে গেছে বলে। শুধু হারিয়ে গেছে তা না, অন্য কারও হয়ে গেছে। ঘরের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে কাঁদছিল আর এসব ভাবছিল নিহিন। হঠাৎ কান্নাটা থামানোর চেষ্টা করল; ভাবল, ধুর এতদিনে ও বিয়ে করবে এটাই তো স্বাভাবিক আর বিয়ে করলে তো বাচ্চা হবেই, শুধু শুধু এত আবেগে ভেসে যাওয়ার মত কোনো ঘটনা ঘটেনি, সে বয়সও আর নেই। ওর নিজের জীবনেও বহু কিছু ঘটে গেছে। কিন্তু নিহিনের কান্নার বেগ আরও বাড়ল। মানুষের মন হলো পৃথিবীর সবচেয়ে অবাধ্য জিনিস!
আজ কিছুতেই ঘুম আসছে না কলরবের। ইদানীং তো বিছানায় শোয়ার আগে ঘুম চলে আসে। কিন্তু আজ যে আসবে না তা খুব ভালোভাবে বুঝে গেছে ও। এপাশ-ওপাশ করছে শুধু। লাইট বন্ধ করলে মনে হচ্ছে অনেক বেশি অন্ধকার, আর লাইট জালালে মনে হচ্ছে আলোটা চোখে লাগছে। হঠাৎ হঠাৎ গলা শুকিয়ে যাচ্ছে, যতই পানি খাচ্ছে তৃষ্ণা মিটছে না। এসব তো হবেই, নিহিন ফোন করেছে আজ। বরাবরই কলরব যেকোনো ব্যাপারে কন্ট্রোল করতে পারে নিজেকে। কিন্তু এই একটা মানুষের ব্যাপারে কোনো কন্ট্রোলই ছিল না। সেই কন্ট্রোলটা এতদিনে এসেছে বলেই ধারণা ছিল ওর। অথচ এখন দেখা যাচ্ছে ধারণাটা ভুল! যাকে ছাড়া জীবনটাই কাটিয়ে দিতে হচ্ছে তার কন্ঠস্বর শুনে এত উতলা হওয়ার কোনো মানে হয় না, কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার সে হচ্ছে। এত বছর ধরে একটু একটু করে ঠিক করা সবকিছু মুহূর্তেই ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে। কেন এমনটা হলো? নিহিন যদি আসারই ছিল ওর জীবনে তবে আরো আগে এলো না কেন? এখন তো কিছুই আর করার নেই কলরবের। হাত পা বাঁধা। এসব ভাবতে ভাবতেই অস্থির রাতটা কাটছিল ওর। শুয়ে থাকতে আর ভালো লাগছে না, ওঠে বারান্দায় গিয়ে একটা সিগারেট ধরালো। সিগারেটে টান দিয়ে আবার ভাবতে বসলো, একটা ফোনকল পেয়ে বোকার মতো এতকিছু ভাবার কী আছে? ওর বিয়ে হয়েছে, নিশ্চই বাচ্চাকাচ্চাও হয়েছে, এতদিন পর সব জানতে পেরে হয়তো খারাপ লেগেছে তাই ফোন করেছে। এসব নিয়ে এত ভাবার আসলে কিছু নেই। কিন্তু হতচ্ছাড়া মনটা তো এসব যুক্তি মানছে না। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু পুরুষ মানুষের এই এক সমস্যা, যতই অস্থির লাগুক, যতই বুকটা ভার হয়ে থাক কান্নার কোনো সুযোগ নেই। কেবল একটা দীর্ঘশ্বাসের মধ্য দিয়েই বুকের চাপা কষ্টগুলো দূর করতে হয়।
পৃথিবীর ছোট্ট একটি দেশের ছোট্ট শহরের দুটি প্রান্তে দুটি মানুষের পরস্পরের জন্য এ হাহাকারের কথা তাদের দুজনের কেউই জানল না।
·
·
·
চলবে..................................................................................