পেট্রা অফিস থেকে বের হতে গিয়ে দেখল, লিফটে কোনো সমস্যা হয়েছে। লিফট বন্ধ। নয়তলার উপর থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বড় ক্লান্ত লাগছিল। আসলে তার এই ক্লান্তি কি শারীরিক নাকি মানসিক? তার স্বামী এবং ছেলে নিখোঁজ। কোথায় আছে কেমন আছে কেউ জানে না। পরক্ষণেই খেয়াল হলো, ভুল ভাবছে সে। প্রিয় এখন আর তার স্বামী নয়। প্রাক্তন হয়ে গেছে। অনুভূতিগুলো প্রাক্তন হয় না কেন? অবশ্য প্রিয় তার স্বামী থাকুক বা না-থাকুক তাতে খুব একটা কিছু যায় আসে না তার। সে আর প্রিয়কে কখনোই চায় না। তবু কেন এই মায়া থেকে এখনো বের হতে পারে না?
কদিন আগেই মা চলে গেলেন। তিনি দিনরাত ভর্ৎসনা করতেন, কিন্তু বটবৃক্ষ হয়ে তিনিই ছিলেন। আগের মতো মায়ের বুকে পড়ে কাঁদতে না পারলেও বাসায় ফিরে মাকে দেখে শান্তি লাগত। সেই শান্তিটুকু হারিয়ে গেছে। প্রিয়াঙ্কা কিছুদিন ছিল, এখন আবার শ্বশুরবাড়িতে চলে গেছে। ওর বাচ্চা ছোট, একা সামলাতে পারছে না এখানে। রায়ান সারা দিন ঘরের মধ্যে বন্দি করে রাখে নিজেকে। হঠাৎ হঠাই কেঁদে ওঠে। সকালে রান্না করে রেখে আসে পেট্রা, ফিরে দেখে রায়ান কিছুই খায় নি। রাতে সে নিজে জোর করে মুখে তুলে দিয়ে একটু খাওয়াতে পারে। ভাইয়ের এমন অবস্থা দেখে তার হতাশ লাগে। মা কেন এভাবে চলে গেলেন? বিয়ে ভেঙে গিয়েছিল তাতে কী হয়েছে? একটা মানুষের জীবনে বিয়েটা কি এতই জরুরি?
চারপাশটা এত অন্ধকার লাগছে কেন? সিঁড়ির সব আলো কি নেভানো? সন্ধ্যা হয়ে গেছে এখনো আলো জ্বালায় নি কেন? আরে ভূমিকম্প হচ্ছে নাকি? বিল্ডিংটা এত নড়ছে কেন? মাথাটা ঘুরছে! দুহাতে মাথা চেপে ধরে সিঁড়িতেই বসে পড়ল পেট্রা।
—————
প্রিয় কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম গিয়ে ভাবতে লাগল, কোথায় যাওয়া যায়? সে জানে এখানে থাকাটা নিরাপদ নয়। স্বাভাবিকভাবেই যে-কোনো মানুষ কক্সবাজার থেকে বেরিয়ে প্রথমে চট্টগ্রামই আসবে। এটা সবাই বোঝে। এই গাড়ি নিয়ে যাওয়াটাও বিপজ্জনক। তাই গাড়ি ছেড়ে দিল। আলীকদম বা লামার ওদিকে গেলে নিরাপদ ছিল, কিন্তু ওখানে তো কোনো হোটেল নেই। আদিবাসীদের ঘর ভাড়ায় পাওয়া যায়। কিন্তু বাথরুম নেই, খাওয়াদাওয়ার সমস্যা, পানির সমস্যা, কোনো সুযোগ-সুবিধাই নেই। শুদ্ধ থাকতে পারবে না, দুদিনে অসুস্থ হয়ে যাবে। সবচেয়ে বড় সমস্যা–হাঁটতে হবে, শুদ্ধ তো এত হাঁটতে পারবে না। আবার লামাতে নাকি এখন গন্ডগোল চলছে।
অন্যকোথাও গেলেও ভালো হোটেলে ওঠা যাবে না আর। বাবর খান এখন পুরো বাংলাদেশের ভালো হোটেলগুলোতে চিরুনি তল্লাশি চালাবে। আর যেমন তেমন হোটেলে শুদ্ধর জন্য সমস্যা হবে। অনেক ভেবে প্রিয়। খুলনার এসি বাসের দুটো টিকিট কাটল। তারপর আরও বেশ কিছু টাকা তুলল। খুলনা গিয়ে আর টাকা তোলা যাবে না। এখনো ব্যাংকে তার যা টাকা আছে তাতে দু-তিন বছর বাপছেলের অনায়াসে কেটে যাবে। তারপর নিজের মনেই হেসে উঠল–বাবার হাত থেকে সে দু-তিন বছর কেন দু তিন মাসও পালিয়ে বাঁচতে পারবে না। বাংলাদেশ বাবার জন্য অনেক ছোট একটা জায়গা।
শুদ্ধর কান্না থেমেছে তবে মন খারাপ করে বসে আছে। সমস্যা নেই, এক্ষুনি ওর মন ভালো করে দিতে পারে প্রিয়। বাস ছাড়তে এখনো দেড় ঘণ্টা বাকি। একটা শপিংমলে গিয়ে শুদ্ধ এবং নিজের জন্য কিছু জামাকাপড় কিনল সে। হোটেল থেকে বের হওয়ার সময় ঝামেলায় পড়ে কাপড়ের ব্যাগটা আনা হয় নি। শুধু ল্যাপটপের ব্যাগটা এনেছে। জামাকাপড় কেনা শেষ হলে সাধারণ একটা কমদামি মোবাইল কিনল। কেনাকাটা শেষ করে কাউন্টারে যেতে যেতে দেখে বাস এসে পড়েছে। কিছু খাবার কিনে বাসে উঠে গেল তারা। বাস ছাড়তেই প্রিয় নতুন মোবাইলে পুরোনো গোপন একটা সিম চালু করল। তারপর শুদ্ধকে বলল, এখন আমরা পেট্রার সাথে কথা বলব।’
শুদ্ধর চোখেমুখে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ।
‘সত্যি বাবা!
হুম সত্যি। কিন্তু কিছু শর্ত আছে।
‘কী বাবা? তাড়াতাড়ি বলো আমি সব মানব।’
‘মাকে বলা যাবে না আমরা কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি। ঠিকাছে?
‘আচ্ছা বাবা। কিন্তু মা জানলে কী হবে?
‘কাউকে জানাব না আমরা।’
‘মাকেও না?
‘না। থাক তোর বোধহয় কথা বলার ইচ্ছে নেই।’
‘সত্যি বলছি বাবা, আমি কিছু বলব না। প্লিজ কথা বলতে দাও।’
পেট্রার নতুন নম্বর জানে না প্রিয়। পেট্রা অফিসের নম্বরও দেয় নি। একমাত্র উপায় রায়ান। অনেক দোনোমনা করে রায়ানকে ফোন করল প্রিয়। রায়ান মায়ের কথা বলতে বলতে বাচ্চাদের মতো কাঁদল। প্রিয়র মনে হলো, রায়ান যে কারও কাছে গিয়ে কাঁদবে এমন মানুষও নেই কেউ। দুই ভাইবোন হয়তো পরস্পরের কথা ভেবেই কান্নাকাটি করতে পারে না। রায়ানকে অনেকক্ষণ ধরে সান্তনা দিল প্রিয়। অনেককিছু বোঝাল। তারপর পেট্রার কথা জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারল সে এখনো অফিস থেকে ফেরে নি। পেট্রার নম্বর চাইলে বলল, ‘প্রিয়দা, রাগ কোরো না। পেট্রাদি ফিরলে আমি তোমাকে ফোন করব। ওর কাছ থেকেই নম্বরটা নিয়ো।
‘বুঝেছি। মনে করে ফোনটা দিস ভাই। শুদ্ধ অনেক কান্নাকাটি করছে, ওর সাথে কথা বলতে চাচ্ছে।
‘ও কি কাছেই আছে? দাও না একটু কথা বলি।
প্রিয় ফোনটা শুদ্ধর কাছে দিতেই বলল, ‘মামা, তুমি আর মা কি এখনো কান্না করো?
রায়ান হেসে ফেলল।
—————
ভোরবেলা প্রিয় ও শুদ্ধ খুলনায় পৌঁছাল। প্রিয় চালক ও গাইডসহ একটা স্টিমার ভাড়া করেছে, এক সপ্তাহের জন্য। স্টিমারের বিছানার ওপর যে তোশক ছিল সেটা দেখে গা ঘিনঘিন করে উঠল প্রিয়র। বাজারে গিয়ে নতুন তোশক, বালিশ, বিছানার চাদর, কম্বল, বালিশের কভার ইত্যাদি কিনল। এক সপ্তাহের জন্য চাল, ডাল, মসলা, মুরগিও কিনে নিল। গাইড বলল, নদী থেকে মাছ ধরে নেবে আর কিছু লাগলে কাছের কোনো বাজারে নেমে কিনে নেওয়া যাবে।
সকাল আটটার দিকে স্টিমার ছাড়ল সুন্দরবনের উদ্দেশে।
শুদ্ধ বলল, আচ্ছা বাবা, মামা যে বলল মা ফিরলে কল দেবে, কই আর তো কল করল না!’
‘কী জানি বাবা! আমি তো রাতে তোর মামাকে আবার কল করলাম। ধরল না তো।
‘এখন আরেকবার কল করো না বাবা, প্লিজ।
প্রিয় আবার কল করল, কিন্তু রায়ান ধরল না। প্রিয় শুদ্ধকে কোলের মধ্যে নিয়ে বসল। তারপর বলল, ‘চিন্তা করিস না বাবা। মা যখন শুনবে আমরা কল করেছিলাম তখন নিজেই কল করবে। হয়তো মামা ভুলে গিয়েছিল বা মা বাসায় না ফিরে প্রিয়াঙ্কা আন্টির বাসায় চলে গিয়েছিল।
‘তাও ঠিক।’ কিন্তু ছেলেকে এসব বলে বোঝালেও প্রিয়র মন এসব মানতে চাইছিল। মনে হচ্ছিল কোথাও কিছু-একটা ঠিক নেই। ওদিকে শুদ্ধ ভাবছিল, মায়ের নম্বরটা তো তার মুখস্থ আছে। বাবাকে কি বলবে? না থাক, মা তো মানা করেছিল।
·
·
·
চলবে....................................................................................