মৌনচন্দ্রা - পর্ব ১১ - নবনীতা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

          আমি বেডসাইড টেবিল থেকে পানির বোতলটা নিয়ে এক নিঃশ্বাসে পুরোটা খেয়ে নিলাম। কিছুটা স্বস্তি পেয়ে ফের লেখা শুরু করে দিলাম—

“মেজবাহ? অবাক হলেন? কিংবা সামান্য বিস্মিত? প্রথমবার তো! আমার প্রথম প্রেমে পড়ার ব্যাপারটা অনেকটা কুমিরভর্তি জলে নেমে নিশ্চিন্তে, নির্ভয়ে, সময় নিয়ে স্নান করার মতো। কেননা আমি জানতাম না—সে অভিজ্ঞ, সে চেনে মেয়ে হৃদয়ের গোপন পদক্ষেপগুলো, সে বোঝে একটা মেয়ে কী বললে লাজুক হাসে, কী বললে মুখ ফেরায়। সে ভীষণ ধুরন্ধর লোক, সে অত্যন্ত গভীরভাবে জানে—একটা মেয়ের মনে কীভাবে প্রেম বোনা যায়। আমার সাথে তার ওরকম গভীর প্রণয় টাইপের ব্যাপার-স্যাপার ছিল না। শুধু নিয়ম করে স্কুল, কোচিং, ব্যাচ শেষে রোজ সন্ধ্যায় তাকে ম্যাসেজ দিয়ে সারাটাদিন কীভাবে কাটল, তা জানাতে থাকতাম, সে শুনত। শ্রোতা থেকে আমার বক্তা হয়ে ওঠার মধ্যেই প্রেম ও একই সাথে সর্বনাশের সূচনা।

মেজবাহ, হাঁপিয়ে উঠছি লিখতে লিখতে। এরপরের গল্পটা করুণ। লিখতে কষ্ট হবে আমার। কোনোদিন সুযোগ হলে আপনাকে সামনা-সামনি বলব। সামনে কেউ থাকলে, আমি কান্না করতে পারি না। একা আছি, লিখতে লিখতে কেঁদে ফেলতে পারি। আমার কান্না করতে ভালো লাগে না। অসুস্থ হয়ে পড়ি। তাই চাইছি না এরকম কিছু। 
পরিশেষে আমরা ভালো থাকতে চাই। ভালো থাকা নিয়েই আমাদের যত আয়োজন।

পুনশ্চ: এটা আপনার ফিরতি চিঠিটি নয়, সেটা সুস্থির হয়ে লিখব। এটা একটা দুঃখ চিঠি। ভীষণ মন খারাপকে দুটো ভাগ করলাম, একভাগ আপনাকে বিকিয়ে দিয়ে মুচকি হাসলাম।

_aradhya_ 
June 4, 2017 2:13 PM
Somewhere in Bangladesh

—————

চিঠিটা পাঠিয়ে আর মনে হলো, একটা চিঠি পুরোপুরি এতটা দুঃখচিঠি হতে পারে না। আমার এই চিঠিটা অসম্পূর্ণ। এখানে শুধু আমি আছি। এখানে সুখ নেই। আড়মোড়া ভেঙে শাওয়ার নিতে চলে গেলাম। এসেই ফিরতি চিঠি আরেকটা চিঠি লিখতে বসে যাব।

শাওয়ার নিয়ে চিঠিটা লিখতে বারান্দায় গিয়ে বসতে চেয়েছিলাম। সেখানেই দেখতে পারলাম, রাস্তায় একটা ছেলে আর একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে আছে বললে ভুল হবে। ছেলেটা চিৎকার করে যাচ্ছে আর মেয়েটা কেঁদে যাচ্ছে। আওয়াজ এ অবধি আসছে... ছেলেটা বলল,
-“কী সমস্যা রে তোর? বলছি না ব্রেকআপ? তাও কেন মুখ মারাইতে আসছোস এনে?”

ছেলেটার কথাবার্তার বিচ্ছিরি টোনেই আমার বিতৃষ্ণা চলে এলো। এই কথার প্রেক্ষিতে সে তো একটা থাপ্পড় ডিজার্ভ করেই। মেয়েটা কী করে সেটা দেখতে ইচ্ছে করলাম।

আশ্চর্য আশ্চর্য আশ্চর্য! মেয়েটা পায়ে পড়ে গেল? পায়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে কিছু বলে যাচ্ছে। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম না। অস্পষ্ট শুনে গেলাম, 
-“আমি আর তোমাকে কিছু বলব না। প্লিজ।”
-“তোরে আমার ভাল্লাগে না আর।”
-“আমি তোমার মনমতো হয়ে যাব। যেমনটা ভাল্লাগে.. তেমনটাই হয়ে যাব!”

লোক জড়ো হয়ে যাচ্ছে। তামাশা দেখছে এরা। আমি খট করে বারান্দার গ্লাস আটকে দিয়ে রুমে চলে এলাম। পর্দাটাও টেনে দিলাম চরম বিতৃষ্ণায়। এর চেয়ে রুমে বসেই চিঠিটা লিখতে বসি। তবু শালার মেয়েলোক এত ছ্যাচড়া যে কেন?

—————

মেজবাহ,
আপনার দেওয়া সম্বোধনটা খেয়াল করেছেন? “প্রিয় আরাধ্যা”!?
কেউ আজন্ম তপস্যা করেও প্রিয়র স্থান নিতে পারে না, সেখানে আমি মাত্র দুটো চিঠি আর কিছু শব্দেই? আপনি নিশ্চিত?

আমার শহরে এখন গোধুলি। আমি জানি না, ঠিক কেন আপনাকে লিখতে এলেই আমি বারান্দায় চলে যাই! আজ শাড়ি পরিনি। সাদা ওভার সাইজ টিশার্ট পরে আছি। শাড়ি পরলেও কাজল সবসময় লাগাই না। আমার সাজগোছ পছন্দ না তেমন। তবে! যদি মনের ইচ্ছে হয়, মন সাজতে চায়, তবে মোটা করে কাজল নিয়ে, কপালে টিপ আর খোলা চুলে বসে থাকি। যদি আরও সাজতে ইচ্ছে করে, তবে...

গতকাল ভোরে উঠে গোসল সেরে শাড়ি পরেছিলাম। লাল টকটকে শাড়ি। সঙ্গে স্লিভলেস লাল ব্লাউজ। আটপৌরে ধরনে, কিছুটা উঁচু করে পড়েছিলাম। হাতে, পায়ে আলতা নিয়েছিলাম। নিচনাকে নথ, বাহুতে বাজু, হাত ভর্তি চুড়ি আর পায়ে রূপার মোটা নূপুর। চুল খুলে আয়নার সামনে বসে নিজেকে দেখছিলাম। ঠিক যেন চোখের বালির আশালতা! 

সকালবেলা উঠে থেকে এলোমেলো লাগছিল। রাতে ঘুমাতে পারিনি একদমই। তাই মাথা ব্যথাও হাজির। কফি বানিয়ে চিপস নিয়ে সেই যে ডায়ারিগুলো ধরে বসেছিলাম! একেবারে দুপুর। তারপর আপনার চিঠিটা পুরোপুরি আবার পড়লাম আর লেখা শুরু৷ 

আপনার এই লাইনটা আমার মারাত্মক মনে ধরেছে। ইচ্ছে হয়েছে বলেই ঘুমের মূল্যে পাগলামো কিনলেন এক ছটাক। এদিকে আমি অজস্র পাগলামো করি, বিনিময়ে ঘুম কেনার তাগিদে। অদ্ভুত ব্যাপার!

আমি শাড়ি পরি কারণ শাড়িতে নিজেকে বউ লাগে। আমার বউ সাজতে ভালো লাগে। ইচ্ছা করে খুব। একার সংসারে, একা বঁধু। ভালো না?

আমার সন্ধ্যায় চা খাওয়া একটা নিয়ম। দিনে অসংখ্য কাপ শেষ দেওয়া হয়। আমি জানি না, এই চায়ের প্রতি আমার এত আহ্লাদ কোত্থেকে উদয় হলো! হয়তো যদি কখনও জীবনত্যাগের পূর্বে আমাকে কেউ বলে, “রাজকন্যা, আরাধ্যা? আপনার একটি ইচ্ছে আমরা পূরণ করব।”

আমি ঠোঁট উলটে বলে উঠব, “ভাইসাব, চা হবে?”

লেখা থামিয়েছিলাম সন্ধ্যার দিকে। আবারও বারান্দায় গিয়ে বসে ছিলাম। অন্ধকারে ভালো লাগছিল। আলো জ্বালাতে ইচ্ছে করছিল না। এভাবে কখন যে মাগরিবের আজান শেষে এশার ওয়াক্ত শুরু হয়ে গেল! এক ঘন্টারও বেশি সময় একদম নিশ্চুপ বসে ছিলাম। এখন আবার ফোন হাতে তুললাম। আমি খুব করে টের পাচ্ছি, আমার খুদা লাগতে শুরু করেছে আস্তে-আস্তে। কিছু রান্না করি গিয়ে। এরপর খেতে খেতে আবার লিখব।
যাওয়ার আগে একটা কথা! মেজবাহ, আপনি চমৎকারভাবে কথা বলতে জানেন৷ আমি প্রচণ্ডরকমভাবে কথা এগোনোর আগ্রহ পাই।

—————

রাত ১০টা ১১ বাজে।
আমার কাঠগোলাপ পছন্দ, তবে প্রিয় ফুল হিসেবে নয়। আমি বুঝি না, কাঠগোলাপে এমন কোন বিশেষ দিক আছে, যাতে করে একজন মানুষ এটাকে সবচেয়ে সুন্দর ফুল হিসেবে যেখানে সেখানে বলে বেড়ায়? ফেসবুকে না এলে তো জানতেই পারতাম না, এটার জনপ্রিয়তা এত! 
আমার প্রিয় ফুল বেলি, কৃষ্ণচূড়ায় মুগ্ধতা, শিউলিতে স্নিগ্ধতা, পদ্মে অনুরাগ আর জবাফুলে গা শিউড়ানো প্রেম আছে। যদি যে-কোনো একটি ফুল বেছে নিতে বলা হয়, আমি নিজেকে বেছে নেব। আপার পদ্মফুল আমি! 

আমার চোখ তেমন সুন্দর নয়। তবে মোটা করে কাজল লাগালে সুন্দর লাগে। এটাও আপা বলে। (আমি মনে প্রাণে মানি।) 
এখন জীবনের ছন্দে সুর আছে কি না, তা জানার জন্য গান শিখতে হবে? তবে খুঁজে দিন কাউকে, যে সুন্দর করে শেখাতে পারবে।

আমরা ভালোবাসা চাইতেই পারি, কেউ ভালোবাসবে কি না আমাদের—সেটা তো সম্পূর্ণ তাদেরই ব্যাপার৷ এই এক কথাকে ভিত্তি করে এত বড়ো হলাম, হচ্ছি। জীবন চলার মন্ত্র বুঝি এটাই, মেজবাহ? জীবনকে কন্ট্রোলে রাখা যায় গুটি কয়েক মন্ত্র জানলে, তাই না?

আপনার প্রথম চিঠিতে লেখা একটা লাইন, "Life is too short to be bored & die, right?" সম্ভবত এই একটি বাক্য না থাকলে আপনাকে আমার চিঠি লেখা হতো না। আমাদের কল্পনাগুলো কী সুন্দর, মেজবাহ! জীবন্ত সুন্দর। অথচ আমরা যা মনে প্রাণে চাই, তা-ই মনের মতো পাই না।

আমার শ্রীকান্ত আচার্যের বৃষ্টি তোমাকে দিলাম গানটা কী যে পছন্দের! জোর করে রাত জাগতাম? উহুম উহুম, উড়ন্ত বয়স, ডুবন্ত সময়, প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া মন। রাত জাগার ইচ্ছে জাগবে না? আমি খুব জঘন্য প্রেমিকা ছিলাম, মেজবাহ। প্রেম করতে পারতাম না।

আমি মায়ায় ফেলতে জানি, এটা চন্দ্র-সূর্যের মতন সত্য একটা বিষয়। আপনি হয়তো টের পাচ্ছেন অল্প অল্প করে। আপনি বলুন, সুন্দর না? 

তার জন্য হৃদয় পুড়িয়ে কী লাভ যার নিজের হৃদয় পোড়ে না! এত সুন্দর করে কথা বলতে জানেন, মেজবাহ? আমি অনুভূতিকে ভাষায় প্রকাশ করতে পারি না, আপনি পারেন। কী করে পারেন?

আপনিও বলেন, জীবনে বিরক্ত হওয়াও প্রয়োজন? এটা কত সত্য কথা, তা আপনি আর আমি বুঝি। বাকিরা বোঝে না। ওরা শুধু কপাল কুঁচকে ফেলে। এই কপাল কোঁচকানোতেও নান্দনিকতা আছে। ওরা নির্বোধ! এত সুন্দর অনুভূতিগুলো অপছন্দ করে বসে থাকে! 

মেজবাহ, আপনাকে লিখতে ইচ্ছে করছে খুব। আপনার কাছে আবারও বক্তা হয়ে উঠছি আমি। সাড়ে এগারোটা বেজেছে। ঘুম পাচ্ছে খুব। চিঠিটা এখন পাঠাতে মন সায় দিচ্ছে না। ঘুম চোখে লেখা চিঠিতে ভুলের পরিমাণ বেশি থাকে। তারপরই মনে পড়ছে, কী আর আছে জীবনে? যা হওয়ার হবে। আপনি তো আমায় বোঝেন...

পুনশ্চ ১: গান শোনাবেন, মেজবাহ?
পুনশ্চ ২: আমাদের এই চিঠি দেওয়া-নেওয়া ও এর শব্দগুলো কাগজের পাতায় ছাপিয়ে যদি কেউ বই লিখত, তবে নাম কী হওয়া উচিত, মেজবাহ? 

_aradhya_
June 5, 2017 2:34 AM
Somewhere from Bangladesh
·
·
·
চলবে…………………………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp