সোহাগি সাঁঝমল্লার - পর্ব ১৩ - মিথিলা মাশরেকা - ধারাবাহিক গল্প

“ It would be my honor to show up for you সাঁঝ। কখন, কোথায় দেখা করতে চাও বলো? Shayanno Hamid will be there. Anytime and anywhere for you!”

ধড়ফড়িয়ে ওঠায় সাঁঝের হাত থেকে পরে যায় ফোনটা। বিছানায় অনড় হয়ে বসে, বিস্ফোরিত চোখে সেকেন্ডদুই সেটার দিক তাকিয়ে রইল সাঁঝ। যেন বুঝে উঠল না, ঠিক শুনল, নাকি ভুল। পরের সেকেন্ডেই দুহাতে ফোনটা হাতে নিলো ও। এলোমেলো হাতে আগে নিজের কমেন্টটা ডিলিট করলো, তারপর আবারো সামনে ফেলে দিলো ফোনটা। সাঁঝের ভেতর থেকে শ্বাস বেরোতে চায় না। দিবার কথা শুনে ও সত্যিই সায়াহ্নর সাথে যোগাযোগের উপায় খুঁজছিল। হুট করেই ওর মনে পরে, অভ্র একবার মেজাজ খারাপ করে সায়াহ্নকে নিয়ে বলেছিল, “ সব দোষ ওই রেডিও মস্তির আরজের!” আরেকটু খোঁজ করতেই সাঁঝ বুঝে গিয়েছিল, রেডিও মস্তির “The Shayanno Show” এই সায়াহ্ন হামিদেরই অনুষ্ঠান। লাইভ অনুষ্ঠানে কমেন্ট করে ও ব্যস বাজিয়ে দেখতে চাইছিল, ওর কমেন্ট আদৌও সায়াহ্নর চোখে পরে কিনা। সে যে ওর কমেন্ট পড়ে অন এয়ারে তার প্রতিত্তোর করবে, তা তো ও কল্পনাও করেনি। সুজি আয়েশে শুয়েশুয়ে শরীর পরিষ্কার করছিল। সাঁঝের হাত থেকে প্রথমদফায় ফোন পরে যেতে দেখেই আটকে গিয়েছিল ও। দ্বিতীয়দফায় সাঁঝের হাত খালি হতে দেখে ও উঠে আসলো। সবটুকো জোর খাটিয়ে, সাঁঝের গায়ের সাথে গা ঘেঁষল। সুজি আশা করছিল দম মেরে বসে থাকা সাঁঝ অমন করতে দেখে ওকে কোলে নেবে। কিন্তু তা হয় না। ঠিক তখনই বাইরে থেকে শোনা যায় ছোট তালুকদারের ডাক,

– আপুই? বাইরে আয়! 

ওড়না মুঠো করে সাঁঝ বিছানা ছেড়ে দাঁড়ায়। ফোন চার্জে লাগিয়ে, বেরিয়ে যায় রুম থেকে। সুজি বিছানার ওপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দরজায় তাকিয়ে রইল। জ্বালানোর পাশাপাশি মাঝেমাঝে অভ্রকে কামড়ে, খাঁমচে দেবারও প্রচন্ড ইচ্ছা জাগে ওর। আপাতত এটা সেই মাঝামাঝি সময়টা। অভ্রর জন্যই এখন সাঁঝ ওকে চোখে দেখল না। 
ওড়না দু কাধে দিয়ে সাঁঝ বাইরে আসলো। ড্রয়িংরুমে মোশাররফ তালুকদার মাশফিককে কিছু কাগজপত্র বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। মিসেস মোশাররফ আহিকে কোলে করে বসা, রুবিও সেখানেই। অভ্র ফোনে গেম খেলতে ব্যস্ত। সাঁঝ ক্ষুদ্রশ্বাস ফেলল। অভ্র আগে অনলাইন গেইম খেলত না। এ কদিনে যতবার ও ভাইকে ফোনের কাছে দেখেছে, গেইম খেলতেই দেখেছে। আসিফ তালুকদার সেসময়ই আইসক্রিমের বক্স হাতে বাসায় ভেতরে ঢুকল। ব্যাগটা সাঁঝের হাতে দিয়ে বলল,

– Mango flavour! তোর ফেভারিট। 

– আমেরই সিজন চলছে আসিফ। টাটকা আম যখন ঘরেই আছে, আইসক্রিমটা অন্য ফ্লেভারের আনতে।

রুবির কথায় উচ্ছ্বল সাঁঝ দমে গেল। তবে আসিফ স্ত্রীর কথায় গুরুত্ব দিলো না। বেসিনে গিয়ে হাত ধুতে ধুতে বলল,

– অভ্র তো স্ট্রবেরি খায়। ওটা আবার আমার পছন্দ না। 

– কিন্তু আমার তো বেশ লাগে।

– As expected! অভ্রর পছন্দই তোমার পছন্দ! তাইবলে সিজারিয়ান অপারেশনের পর আমি এখন তোমার পছন্দের আইসক্রিম আনব রুবি?

আসিফ মেয়েকে কোলে নিয়ে সোফায় বসে গেল। দুজনের কথা শুনে ড্রয়িংরুমের সব মাথা দুলিয়ে হাসল। রুবি সাঁঝকে দেখল, সেও হাসতে হাসতে কিচেনে চলে গেছে। তালুকদার নিবাসের একটা মানুষেরও আজও একবারের জন্যও অনুধাবন হলো না, অভ্রর পছন্দই রুবির পছন্দ না। সাঁঝের পছন্দ রুবির অপছন্দ। সাঁঝ ট্রে তে সাজিয়ে এনে সবাইকে আইসক্রিম দিলো। তারপর মাশফিকের সোফার হাতলে বসে গেল। সবাই খাচ্ছিল। কাগজপত্র সরিয়ে রেখে খাওয়া শুরু করলো মাশফিকও। দুচামচ মুখে পুরে বোনকে বলল,

– তোর থার্ড ইয়ারের ক্লাস কাল শুরু?

ভাইয়ের প্রশ্নে সাঁঝ অবাক হলো না। ও জানে ওর ছোটছোট বিষয়ও মাশফিক মনে রাখে৷ ইশারায় হ্যাঁ সূচক জবাব দিলো সাঁঝ। আসিফ তালুকদার বলল,

– তাহলে সাঁঝ তুই এক কাজ কর। আমি আহির জন্ম নিবন্ধনের অনলাইন এপ্লিকেশন করেছিলাম। কাগজপত্রও সব ঠিকঠাক করে রেখেছি। তুই পরশু কলেজ থেকে ফেরার পথে ওয়ার্ড কমিশনার অফিসে গিয়ে ওগুলো একটু জমা দিয়ে আয়। পারবি না?

– এই কাজটাও তোমার সাঁঝকে দিয়ে করাতে হবে?

সাঁঝের জবাব দেওয়ার আগেই রুবি মুখ খুলেছিল। সবাই একপলক ওর দিকে তাকালো। রুবি রয়েসয়ে যায়। মোশাররফ তালুকদার বললেন,

– তাতে কি? সমস্যা হবে না কোনো। সাঁঝের কলেজের একদম পাশেই কমিশনার অফিস। 

– তাছাড়া আমিও ওকে একা ছাড়ব না! আমার পরিচিত আছে ওখানে। 

আসিফের কথা কানে তুলল না রুবি। বাবার মতো মান্য করা মানুষটার কথায়, মোশাররফ তালুকদারের কথাতেই চুপ রইল ও। এমনিতেও! সমস্যা সাঁঝের কিনা, তাতে ওর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। উল্টো ও চাইছিল না সাঁঝ ওর মেয়ের এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায় নিক। সবার আগে খাওয়া শেষ করলো মাশফিক। টিস্যুতে হাত মুছতে মুছতে বলল,

– আমার দুইএকের মধ্যে কুমিল্লা যেতে হতে পারে। 

– কেন?

– অফিসিয়াল কাজে। না গেলে চলছেই না। দিন গিয়ে দিন ফিরব। 

সাঁঝ মাথা দুলালো। অভ্র যতোবেশি বাড়ি ছাড়তে চায়, মাশফিক ততোবেশি বাড়িপাগল। তালুকদার নিবাসের বাইরে কোথাও থাকতে চায়না ও। কথাবার্তা শেষ করে নিজের ঘরে চলে আসলো সাঁঝ। দরজার কাছে দাড়িয়ে, বিছানায় থাকা ফোনটা দেখল। যেন এখনো তাতে বাজছে, Anytime and Anywhere for you! সাঁঝ অস্বস্তি নিয়ে আগে টেবিলের কাছে গেল। টোট ব্যাগটায় খাতাপত্র গুছিয়ে, একটা বই হাতেকরে ফেরত আসলো বিছানায়। আড়চোখে চেয়ে রইল ফোনের দিকে। কি হলো ওর, পড়ার উদ্দেশ্যে আনা বইটা সরিয়ে রেখে, লাইট অফ করে, কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পরল ও। সুজি উল্টোপাশ হয়ে ঘুমিয়ে ছিল। বিছানায় নড়চড় বুঝে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল সাঁঝ কাথা মুড়ি দেওয়া। সুজির বোধহয় বুকের সাথে চোখও যেন টলমল করে। কি হলো কি আজ সাঁঝের? ওকে কোলে কেন নিলো না সে? এমন পর কি করে হয়ে গেল? কার পাল্লায় পরে হয়ে গেল? ভালোবাসার মানুষটার হুট করেই এমন cng হয়ে যাওয়া কি মানা যায়?

—————

বন্ধ চোখে অকস্মাৎ আলো পরায় চোখ আরেকটু খিচে বন্ধ করে নিলো সায়াহ্ন। আস্তেধীরে চোখ মেলে পাশে তাকালে ওর সর্বপ্রথম চোখে পরে ফুটপাতের ওপরের আয়নার দোকানটা। তার দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা ছোটবড় আয়নাগুলোতে গাড়ির হেডলাইটের আলোর প্রতিফলন হচ্ছে। সেখানকারই কোনোটা ওর চোখে পরেছিল হয়তো। জ্যামে আটকে থাকা অফিস পিকআপ এমনিতেই সায়াহ্নর মেজাজের বারোটা বাজিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট ছিল। তারওপর এই আলোর ঝলকানি! জানালার পাশে বসা সায়াহ্ন কাঁচ তুলে দিতে উদ্যত হয়। ঠিক তখনই ওর কানে আসে চুড়ির আওয়াজ। সায়াহ্ন থেমে গেল। নিজের অজান্তেই চোখ তুলে পুনরায় দোকানের দিকে তাকালো ও। 
দোকানে সাঁঝ ছিল। প্রথমদিনের ক্লাস আগেআগে শেষ হওয়ায় বান্ধবীর সাথে দোকানে এসেছে ও। বান্ধবীর দুল কেনার সময়টায় ও নিজের জন্য চুড়ি দেখছিল। বেগুনীরঙা কামিজ, সাদা ওড়না-সালোয়ার, হাতে বাঝানো টোট ব্যাগ, মাঝখানে সিঁথি করা খোলা চুলের অতি সাধারণবেশের সে রমনী বেশ আগ্রহে চুড়ির গোছা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছিল। 

সায়াহ্নর এবার খেয়াল হলো, দোকানটা কেবল আয়নার দোকান না। সামনের টেবিলের মতো জায়গাটুকোতে হরেক রকমের, হরেক রঙের চুড়ি রাখা। আংটি, পায়েল, মালা, কানের দুলসহ নানার রকমের গয়নাও ঝুলছে। সাঁঝের দু হাতের মুঠোয় চার গোছা চুরি ছিল। ইতিমধ্যে পরে থাকা চুড়িগুলো খুলে নিচে রেখেছে ও। চুড়ি খোলার সময়কার আওয়াজই কানে গিয়েছিল সায়াহ্নর। ওর বাছাই করা চার গোছা চুড়ি থেকে এক গোছা সাঁঝ বাহাতে পরলো। তারপর পাশের এক ল্যাম্পপোস্টের পোলে আস্তেকরে হাতটা বারি লাগালো দুবার। সায়াহ্নর আগ্রহ বাড়ে। ও স্পষ্ট দেখল, সাঁঝ কান এগিয়ে কিছু একটা শোনায় মনোযোগী। কান খাড়া করে,পূর্ণ মনোযোগের সাথে এবার সায়াহ্নও শোনার চেষ্টা চালালো। সাঁঝ একের পর এক চারটে চুড়ির গোছাই হাতে পরলো, পোলে বারি লাগালো, কিছু একটা শুনলো। সায়াহ্নর বুঝে আসে, সে চুড়ির আওয়াজের তীব্রতা পরখ করছিল। কাউকে ডাক লাগাতে গেলে এই চুড়ির আওয়াজকেই ব্যবহার করে সাঁঝ। ওর চুড়ির গোছা পরখ করা শেষ হলে মৃদ্যু হাসল সায়াহ্ন। আপনমনে বলল,

– তিন নম্বরটা।

সিগনাল সবুজ হয়ে যাওয়ায় সায়াহ্নর গাড়ি চলতে শুরু করে। সাঁঝকে পেছনে ফেলে চলে যাচ্ছিল ও। কিন্তু সাঁঝ তখনো ওর দৃষ্টিসীমার বাইরে যায়নি। ড্রাইভিং মিররে সায়াহ্ন স্পষ্ট দেখল, হাতের বাকি চুড়িগুলো নিচে রেখে, তিন নম্বর চুড়ির গোছাটাই দোকানদারকে এগিয়ে দিয়েছে সাঁঝ। ইশারায় বুঝাচ্ছে ওটাই প্যাকেট করে দিতে। শব্দহীন, তবে বড়সড় একটা হাসি দিয়ে, সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো সায়াহ্ন। গাড়িতে বসা ওর বাকিসব কলিগ ঝিমোচ্ছিল। নইলে ওর এ মুহুর্তের হাসিটা দেখলে তারা অবাক হতো। একটু বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলে ওকে হয়তো জিজ্ঞেস করেই বসতো, 

“ ব্যপার কি আরজে? এমন খুশি হচ্ছো কেন? এভাবে হাসছো কেন? অকারনে এমন মিটমিটিয়ে হাসা তো ভালো লক্ষণ না! এসব তো প্রেমের লক্ষণ! গোল্লায় যাওয়ার লক্ষণ! তবে কি তুমি প্রেমে পরলে? সায়াহ্ন হামিদ? শেষমেশ তুমিও কি তবে গোল্লায় গেলে?”

—————

– আর কতো গোল্লায় যাবে তুমি সায়াহ্ন? পুলিশ হওয়ার মতো অপরাধটা আমি কেন করেছি বলতে পারো? সারাটা জীবন তোমার একের পর এক কীর্তি ধামাচাপা দেওয়ার জন্যে?

সাঁঝ চমকে চোখ তুলে তাকাল। ওয়ার্ড কমিশনার অফিসের সামনের বাগানের বসার জায়গায় বসে বই পড়ছিল ও। আসিফ তালুকদারের কথামতো ও আজকে ক্লাস শেষ করে আহির জন্ম নিবন্ধনের কাগজপত্র জমা দিতে এসেছে। কিন্তু এখানে আসার পর জানতে পারল ছোটচাচার পরিচিত অফিসার তখনও আসেনি। আসিফ তালুকদারকে ম্যাসেজ করলে সে খোঁজ নিয়ে জানায় লোক অল্পকিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবে নাকি। সাঁঝের বাসায় চলে আসা বা অপেক্ষা করা, দুটো অপশনই ছিল। ও অপেক্ষা করাকে বেছে নেয়। এরমাঝে অকস্মাৎ সায়াহ্নর নাম কানে আসে ওর। আওয়াজ অনুসরণ করে আশপাশ দেখতেই সাঁঝের চোখে পরল, অফিসের ঠিক বাইরে পুলিশের পোশাক পরিহিত এক লোক উক্ত কথা বলছে, আর তার সামনে দৃষ্টিনত করে দাঁড়িয়ে সায়াহ্ন হামিদ ঘাড়ে হাত বুলাচ্ছে। বই বন্ধ করে সেদিকে মনোযোগী হলো সাঁঝ। সায়াহ্নর সামনে দাঁড়ানো ভদ্রলোক বললেন,

– কিছু বলেছি তোমাকে! তুমি বুঝতে পারছ আমি ঠিক সময়ে না আসলে কি হতো? ট্রাফিক পুলিশকে থাপ্পড় মেরেছ কেন?

– ও ঘুষ কেন নিলো? 

ছেলের পাল্টা প্রশ্ন শুনে সরোয়ার হামিদের কপালে হাত চলে যায়। ঘুরে উঠে এদিকওদিক হাটাহাটি করে, পুনরায় সায়াহ্নর সামনে আসলেন তিনি। নিজেকে সামলে বললেন,

– আচ্ছা ঠিকাছে! বাসায় যাও! এই মুহুর্তে বাসায় যাবে তুমি! 

– বাসায়ই যাচ্ছিলাম। অফিস শেষ আমার।

বিরক্তি নিয়ে জবাব দিলে সায়াহ্ন। সরোয়ার হামিদ একটা শ্বাস ফেলে গাড়িতে বসে গেলেন। ছেলের নামে মারপিটের অভিযোগ শুনে রীতিমতো কলিজা হাতে করে এসেছিলেন তিনি। অবশ্য এটা নতুন কিছু তো ছিল না। সাঁঝ লোককে চলে দেখে বইয়ে মনোযোগ দিলো। কিন্তু মিনিটখানেকের মধ্যে ওর কানে আসে,

– কি ম্যাডাম? দেখা করতে চাইলে, অথচ সময় আর জায়গার কোনো আপডেট দিলে না! ঠিক হলো এটা?

সাঁঝ চকিত চোখে চায়। গাঢ় খয়েরি শার্ট, জিন্স পরিহিত সায়াহ্ন হামিদ ওর সামনেই দাঁড়ানো। প্যান্টের পকেটে ডানহাত গুজে, আরামে দাড়িয়ে, অদ্ভুত হাসির সাথে কথাগুলো বলছে সে। বই বন্ধ করে ধড়ফড়িয়ে উঠে দাড়ালো সাঁঝ। মোবাইলে দ্রুতহাতে টাইপ করল,

– কিসব বলছেন! আমি কেন আপনার সাথে দেখা করতে চাইব?

– দিবার কথামতো।

সাঁঝের প্রসারিত চোখে বিস্ময় আর প্রশ্ন। “ আপনি কি করে জানলেন?” ও না বললেও সে প্রশ্নটা বুঝে যায় সায়াহ্ন। তেমনি হেসে জবাব দিলো,

– অপছন্দ করা সত্ত্বেও আমার সাথে নিজে থেকে দেখা করতে চাইবে, তোমার গিল্টিফিল এতবেশি না। আর আমার কাছে তুমি বা অন্যকাউকে এপেইল করার জন্য বলবে, অভ্রর কলিজাটাও এতবড় না। তাহলে আর বাদ রইলই দিবা। ওর কথাতেই প্রভিউক হয়ে লাইভে কমেন্টটা করে ফেলেছিলে তুমি। তাইনা?

– আমি কোথাও কোনো কমেন্টটমেন্ট করিনি। আপনার ভুল হচ্ছে কোথাও! আপনি হয়তো অন্যকারো সাথে আমাকে গুলিয়ে ফেলছেন।

– কিন্তু এটা তো ওই কমেন্টকারীর-ই আইডি। তার আইডি তোমার ফোনে লগিন করা কেন? 

সাঁঝের বিস্ফোরিত চাওনি। ছোঁ মেরে সায়াহ্নর কাছ থেকে ফোনটা কেড়ে নিলো ও। দেখল সেটার স্ক্রিনে তখন নোটপ্যাড না, ফেসবুক অ্যাপ চালু করা। তীক্ষ্ণ নজরে সামনে তাকালো সাঁঝ। “ আপনি একটা চরম বেয়াদব!” কথা বলতে পারলে ও যে এই কথাটাই বলতো, এবার এটা বুঝতেও সায়াহ্নর অসুবিধা হলো না। তবুও ওর ঠোঁটের হাসি কমলো না। বেশ আনন্দের সাথেই বলল,

– I totally agree with you! আমি চরম বেয়াদব! 

দাঁতে দাঁত চেপে সাঁঝ বসার জায়গা থেকে ব্যাগ, বই হাতে নিতে যাচ্ছিল। কিন্তু সায়াহ্ন পকেট থেকে হাত বের করে সামনে বাড়িয়ে ওকে আটকে দিলো। সাঁঝ রাগী চোখে তাকাতেই ও বেশ গুরুতর ভঙ্গিতে বলল,

– আচ্ছা রিল্যাক্স। আর টিজ করব না। এবার কাজের কথা বলি। যেকারণে তুমি দেখা করতে চাইছিলে।

—————

– দেখো সাঁঝ, অভ্র-দিবা ওরা দুজনেই ছোট। অবুঝ! ওদের জন্য তোমার কনসার্ন হবে, এটা ঠিক আছে। কিন্তু ওদের নিয়ে এতোটাও সিরিয়াস হওয়ার কিছু নেই! কথা না বলাটাই ওদের জন্য ঠিক। এখন যখন দুজনে একটা ভ্যালিড রিজনে একে ওপরের সাথে কথা বলছে না, সেটা তো আরো ভালো হয়েছে! এখানে আমার-তোমার দায়িত্ব নিয়ে ওদের প্যাচআপ করানোর কিছু নেইতো! এতদিন প্রেম করেছে দুজনে। আর তাতে সমস্যাই হয়েছে। অভ্রর মনোযোগের অবস্থা, রেজাল্টের অবস্থা খুবএকটা ভালো না। এখন ওদের থাকতে দাও কয়েকদিন যোগাযোগ ছাড়া। দেখা যাক এর পরিণতি কি হয়। তুমি বুঝেছ আমার কথা?

সাঁঝের চোখেমুখে বিস্ময়। সায়াহ্ন হামিদের কাছথেকে এমন বুঝদারের মতো কথা একেবারেই আশা করেনি ও। যে সায়াহ্নকে সাঁঝের সর্বোচ্চ বেপরোয়া বলে মনে হয়, হুট করেই সে সায়াহ্নকে পৃথিবীর সবচেয়ে বুঝদার ভাই মনে হলো সাঁঝের। না চাইতেও নমনীয় হলো ও। সায়াহ্ন আরো কিছু বলতে যাবে, এরমাঝে ওদের কানে আসে,

– সায়াহ্ন?

হাসানকে দেখে সায়াহ্নর ভেতর থেকে বিরক্তির ক্ষুদ্রশ্বাস বের হয়। কারো সাথে তেমন ভালো সম্পর্ক না হলেও জীবনে কোনো কলিগের ওপর এত বিরক্তিভাব আসবে, সায়াহ্নর ধারণা ছিল না। বড়বড় কদমে হাসান ওদের দিকেই আসলো। সাঁঝকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে সায়াহ্নকে বলল,

– কি খবর? তুমি এখানে?

– কেস খেতে যাচ্ছিলাম।

হাসানের ঠোঁটের কোনে বিদ্রুপাত্মক হাসি ফোঁটে একটা। সে হাসিটা সাঁঝের পছন্দ হলো না। পাশ থেকে ব্যাগ নিয়ে ফোন আর বই বই তাতে ঢুকাতে লাগল ও। হাসান কিছুটা উচু হয়ে সায়াহ্নর কানের কাছে মুখ নিলো। ফিসফিসিয়ে বলল,

– Girlfriend case?

– এমন কিছুনা।

– I understand, I understand! শুরু শুরুর দিকে আমরাও ওই কিছু না-ই বলতাম। By the way! our would be ভাবী, আপনার সাথে দেখা হয়ে খুব খুশি হলাম। 

চলে আসতে উদ্যত হওয়া সাঁঝ আটকায়। ফাঁকা দৃষ্টিতে একবার হাসানকে, তো একবার সায়াহ্নকে দেখল ও। কি বলছে কি এই লোক! কার ভাবী? কিসের ভাবী? সায়াহ্নর বিরক্তি বাড়লো। কখনো বিয়ে করলেও ওর স্ত্রীর সাথে এমন হেসেহেসে মজা করবে, হাসানের সাথে এমন সম্পর্ক ওর না। সে কেবলমাত্র ওদের দুজনকে অস্বস্তিতে ফেলবে বলেই যে এসব বলছে, তা ও বেশ ভালোমতোই জানে। শান্তস্বরে বলল, 

– Stop it Hasan. 

– কেন? থামব কেন? আর হবু ভাবী? আপনি কিছু বলছেন না যে? আপনার হবু স্বামী তো আপনার সাথে কথাই বলতে দিচ্ছে না!

সাঁঝ শক্তহাতে টোটব্যাগটা মুঠো করে ধরলো। দিবাকে নিয়ে কিছুক্ষণ আগ অবদিও ওর কোনো অভিযোগ ছিল না। বয়সের দায় ধরে নিয়ে ও মেনে নিয়েছিল সবটাই। কিন্তু এই মুহুর্তে ওর দিবার ওপর রাগ হচ্ছে। বহুদিন পর কারো ওপর এমন রাগ হচ্ছিল সাঁঝের। দিবা সেদিন তালুকদার নিবাসে না গেলে, ওকে সায়াহ্নর সাথে কথা বলতে অনুরোধ না করলে; ও সায়াহ্নর লাইভে কমেন্ট করতো না। আজ সায়াহ্ন ওকে কথা শোনানোর সুযোগ পেত না। নাইবা এই অচেনা লোকটা ভাবী ভাবী ডেকে ওর মাথা খারাপ করে দেবার মতো পরিস্থিতিটুকো পেতো। সায়াহ্ন আবারো বিরক্তির সাথে মুখ খুলল। বেশ জোর দিয়ে হাসানকে বলল,

– Hasan enough! Now please shut your mouth! Please?

– আরে আরে! ক্ষেপছো কেন?

– কারণ তুমি বাড়াবাড়ি করছো। কোনো ভাবীটাবি হয়না ও তোমার।।

– আসলেও নাকি? তো সেটা ভাবী মুখফুটে বলছে কেন? 

– কারণ ও কথা বলতে জানে না।

হাসান আটকে রইল। সায়াহ্ন হামিদের সাথে ওর মজা করার সম্পর্ক না। অতএব সামনে দাঁড়ানো মায়াবী মেয়েটাকে বোবা বলে সে যে ওর সাথে মজা করবে না, তা হাসান জানতো। কিন্তু তবুও নিশ্চিত হবার জন্য সায়াহ্নর দিকে সেকেন্ড তিনের জন্য
চেয়ে রইল ও। অতঃপর যখন বুঝলো ওর ধারণা সত্য, সায়াহ্ন হামিদ ওরসাথে মজা করছে না, জোরালো একটা হাসি দিলো হাসান। হাসতে হাসতে গা দুলিয়ে বলল,

– আরেহ ওয়াও! বোবা ভাবী? জোশ মিলেছে তোমাদের! এই না হলে Rabb ne bana di jodi! একজন বলার জন্য বিখ্যাত, আরেকজন না বলার জন্য! এমন. . .

বলা শেষ করার আগেই হাসান আঁৎকে উঠে থেমে গেল। বিস্ফোরিত চোখে দেখল,সায়াহ্ন হামিদ ওর বুকের দিকের শার্ট মুঠো করে নিয়ে থেমে আছে। হাসানের বলা কথাটার জন্য ও প্রস্তত ছিল না। যারফলে ওর প্রতিক্রিয়াও ছিল তাৎক্ষণিক। সায়াহ্ন চোখ বন্ধ করে বড়সড় একটা দম নিলো একটা। অতঃপর চোখ মেলে সাঁঝের দিকে তাকাল। তার ভাসাভাসা দুচোখ তখন জলে ভরপুর। যখনতখন বাধভাঙা অশ্রু সামনেরজনের হৃদয়ে তান্ডব তুলে দিয়ে যাবে, এই দশা। জলভরা সে চোখজোড়া দেখে সায়াহ্নর হাত আলগা হয়ে আসে। অজান্তেই হাসানকে ছেড়ে দিলো ও। সাঁঝ আর একটাসেকেন্ড দাঁড়ালো না। হাতে ঝুলানো ব্যাগটা ধরে, একপ্রকার ঝড়ো হাওয়ার মতো চলে গেল ওখান থেকে। 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp