প্রেমদাহ - পর্ব ১০ - মীরাতুল নিহা - ধারাবাহিক গল্প

          দুপুরের আলসে রোদ ঘরের জানালা ছুঁয়ে সুমনার গায়ে এসে পড়েছে। ছাদ থেকে একটানা পাখির ডাক ভেসে আসছে। বাতাসে হালকা আম গাছের পাতা দুলছে। বুকের ভেতর একফালি শূন্যতা জমে আছে অনেক দিন ধরে। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। মুঠোফোনটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল সুমনা। তারপর সাহস করে নম্বরটা টিপল। মনে হচ্ছিল, রাজ এবার হয়তো ধরবে না। কিন্তু রাজ ফোন ধরল।

“কি খবর?”

রাজের কণ্ঠে কোনো উচ্ছ্বাস নেই, ছিলে না বললেও নয়, যেন একেবারে ক্লান্তি মিশে আছে। সুমনা বললো,

“কেমন আছো?” 
“ভালো, তুমি? 
“বাবুর মুভমেন্ট হচ্ছে?”
“ঠিকই আছে।”

কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকার পর সুমনাই শুধালো,

“দুপুরে খেয়েছো?” 
“হু, তুমি খেয়েছো তো?”

সুমনা ছোট্ট করে “হুঁ” বললো।

রাজের পরের প্রশ্নটা খুব পরিচিত,

 “আর কিছু বলবে?”

সুমনা একটু চুপ থেকে বললো, 

“রাখবে?”
 “হ্যাঁ, কাজ আছে।”

সুমনার গলার স্বর একটু কেঁপে উঠলো,

 “আসলে... আরেকটু কথা ছিলো।”

রাজ একটু ভ্রু কুঁচকে বললো,

 “বলো কী?”

সুমনা নিঃশ্বাস ফেলে বললো,

 “তোমাকে মিস করছি, ভীষণ।”

এই কথার পর কিছুক্ষণ কোনো শব্দ নেই। নীরবতা ঘনিয়ে আসে। তারপর রাজ একটু গম্ভীর কণ্ঠে বললো, 
“ওখানে তো তোমার মা আছে। খেয়াল রাখবে। এখানে কে আছে? আমি তো কাজেই থাকি ব্যস্ত। আর যাবার সময় সংসারের কাজ নিয়ে তোমারই তো অভিযোগ ছিল। তাই ভাবলাম, এই ভালো। বাবার বাড়িতে যত্নে থাকবে।”

সুমনার চোখ জ্বালা করে ওঠে। কিছু বলতে পারে না। বুকের মধ্যে জমে থাকা কথাগুলো আটকে যায়। সময়টা থেমে যায় যেন। হঠাৎ খেয়াল করে, ওপাশে রাজ নেই। ফোন কেটে দিয়েছে। সুমনা চুপচাপ ফোনটা বিছানায় রাখে। জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়ায়। সব আগের মতোই আছে। শুধু তার ভেতরটা আর আগের মতো নেই। সুমনা কিছুক্ষণ বিছানায় চুপচাপ শুয়ে ছিলো। জানালার পর্দা হালকা দুলছে, বাইরের রোদটা ধীরে ধীরে ঘরের মেঝেতে গড়িয়ে পড়ছে। হঠাৎ কি যেন মনে পড়ে গেলো। একটা চিন্তা বিদ্যুতের মতো মাথায় খেলে গেলো রাজ কি আজকের মত হঠাৎ এমনই ব্যস্ত হয়ে থাকে? নাকি— তার বুকের ভেতরটা কেমন ধপ করে ওঠে। দ্রুত ফোনটা তুলে নেয়। রাজের নাম্বারে কল দেয়।

ফোন ওয়েটিং। হৃদপিণ্ডটা যেন একটু থেমে যায়। সে অপেক্ষা করে, যদি ফোনটা কেটে ফিরে আসে, যদি রাজ ফোন করে। কিন্তু না। সময় যেন জড়িয়ে পড়ে এক অচেনা দোলাচলে। আধা ঘণ্টা পর আবার কল দেয়। আবারও একই ফল—ওয়েটিং।

সুমনার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ভারি হতে থাকে। চিন্তার খোলস ভেঙে পড়ে সন্দেহের কাটায়। সে বুঝে উঠতে পারে না—এত কার সঙ্গে কথা বলছে রাজ? এত সময় ধরে? কে এমন যার কথা রাজ থামাতে পারছে না? এইতো রাজ বলছিলো সে ব্যস্ত!

সে একা বিছানায় বসে থাকে। একেকটা প্রশ্ন ঝড় তোলে—কিছু লুকোচ্ছে না তো রাজ? নাকি পুরোটাই সে বেশি ভাবছে? একলা থাকার ফলে? মনকে বোঝালো উল্টাপাল্টা ভাবনা চলবে না। কিন্তু ভাবা কি থেমে থাকে? হঠাৎ একাকীত্বটা খুব তীব্র হয়ে ওঠে। বুকের বা পাশে যেন ভারী কিছু চেপে বসে। সুমনা নিজেই অনুভব করে, কতদিন হয়ে গেল রাজ তাকে ছুঁয়ে দেখেনি, একটুখানি স্নেহ, কোমলতা নিয়েও পাশে বসেনি। অথচ একসময় সুমনাকে ছাড়া রাজের সময়ও আঁটকে থাকতো। সুমনা চোখ বন্ধ করে সেইসব মুহূর্তগুলো মনে করে।

পুরনো সব ভাবতে ভাবতে, চোখের কোণে জল জমে উঠছে। সে ভাবলো, না! এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। এতদিন ধরে একা একা থেকে যেন সম্পর্কটাই ফিকে হয়ে আসছে। রাজের পাশে থাকলে হয়তো সব ঠিক হয়ে যেত। কাছে থাকলেই হয়ত সব কঠিন দুরত্বও ঘুচে যায়
সুমনা, নিজেকেই বোঝালো—একটা সম্পর্ক শুধু দূরত্বে থেমে গেলে চলে না। 
ভেবেই ফেলে ক’টা দিনের জন্য ওই বাড়ি থেকে ঘুরে গিয়ে, আবার ফিরে আসবে। রাজের কাছে। তার স্পর্শে। তার ভালোবাসায়। যেই ভাবা, সেই কাজ।
সুমনা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। পেটটা এখন অনেক ভারি হয়ে এসেছে—নাভির উপর নিচ থেকে যেন একটি আস্ত পৃথিবী তার ভেতরে গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে। হাঁটতে গেলে কোমরের দুই পাশ ভারসাম্য রাখতে কষ্ট হয়। ঘাড়ের নিচ থেকে ঘাম গড়িয়ে পড়ে, কপালে নেমে আসে ক্লান্তির রেখা।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে দেখে—তার শরীর এখন শুধু তার একার না, তার ভেতর আরেকটি প্রাণ। যৌবনের ঠিক পরে, মাতৃত্বের আগে এক অদ্ভুত রূপে ফুটে উঠেছে তার চোখ-মুখ। পেটের ওপর হালকা হাত বুলিয়ে দেয়। শরীরের খোলা রেখায় খেলে যায় কোলজিন–ভাঁজ, আড়ালে লুকানো নতুন জীবনের আগমনচিহ্ন।
"তুই কি মেয়ে না ছেলে?"
নিঃশব্দে বলে ওঠে সে। আল্ট্রাতে চিকিৎসক নিরুত্তর ছিল। বলেছিলো, 
“এসব জানাতে নেই।” 
তবে যাই হোক, সন্তানটা ঠিক তার—তার বুকের ভেতর স্পন্দিত। হাত-পা ধুয়ে কাপড়চোপড় বদলায়। একটা হালকা কালচে গোলাপি কামিজ পরে, সাদা ওড়না জড়িয়ে নেয় বুকের সামনে। প্রেগন্যান্সিতে গরমে বোরখা পড়লে চলতে কষ্ট হয়ে যাবে। তারপর একহাত পেটের নিচে, অন্য হাতে ব্যাগ তুলে নিয়ে বেরিয়ে আসে ড্রয়িংরুমে। ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই মা তাকিয়ে জিগ্যেস করেন,
"এই, কোথায় যাবি? এই অবস্থায়!”

সুমনা খুব স্বাভাবিক গলায় বলে,

“ও বাড়ি যাই একটু। ঘুরে আসি।”

মা কিছুক্ষণ মুখের দিকে চেয়ে থাকেন। চোখে সন্দেহ আর উদ্বেগ মিশে থাকে।

“একা যাবি?”
“না, সিএনজি নিবো। বেশি কিছু না, ক’টা দিন থেকে আসবো।”

পাশ থেকে দাদী তখনই কাশির ছলে একটানা বলে ওঠেন,
”জামাই ছাড়া একদমই ভালো লাগতাছে না, নাকি? তাই বইলা এখনি ছুটে যেতে হবে? পেটেরটার কথা ভাব।”
একটা পাতলা টিটকারি ঝরে পড়ে দাদীর কণ্ঠে। 
সুমনা কিছু বলে না। মা কণ্ঠ নরম করে বলেন,

“শরীর কিন্তু ঠিকঠাক না। এই সময় সাবধানে চলাফেরা করিস।”

সুমনা শুধু মাথা নেড়ে বলে,
"হ্যাঁ, খেয়াল রাখবো।”

তার এই যাওয়ার পেছনে একরাশ শূন্যতা জমে আছে, অভিমান জমে আছে, জমে আছে এক ফোঁটা ভালোবাসার ক্ষীণ আশা। রাজ যদি পাশে থাকত, তবে এমন করে যেতে হতো না। কিন্তু সে আর থাকতে পারছে না। এই ঘরে, এই নিঃসঙ্গ দুপুরে, প্রতিটি চেনা সময় কেবল রাজের অনুপস্থিতি চিৎকার করে।  

সুমনা চুপচাপ বেরিয়ে পড়ে—মা কিছু বলেন না, শুধু দরজার ফাঁকে দীর্ঘশ্বাস দেন। তাকিয়ে থাকে যতক্ষণ না সুমনা গাড়িতে উঠে। একটু পর গন্তব্যে পৌঁছেও যায়। সুমনা সিএনজি থেকে নামার সময়ই দেখে গেট খোলা। বেলি ফুলের গাছগুলো এখন গ্রীষ্মের রোদে খানিক বিবর্ণ, তবু গন্ধটা সুন্দর। ভেতরে যাওয়ার সময় সুমনার বুক ধুকপুক করতে থাকে। দরজায় টোকা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভেতর থেকে শ্বাশুড়ির গলা আসে—

“কে রে?”
“আম্মা, আমি। সুমনা।”

দরজা খুলেন শ্বাশুড়ি। মুখে অবাক ও ভেতরে মিশ্র আনন্দ।
“আরে সুমনা! তুমি হঠাৎ! আসো আসো ভেতরে আসো!"

ভেতরে ঢুকতেই দেখে, খোলামেলা ড্রয়িং-ডাইনিংয়ের মাঝে শ্বাশুড়ি মাটিতে পাটি পেতে বসে বেগুন, বরবটি কাটছিলেন হয়ত। পাশেই কাঁচা মরিচ-রসুন ছড়ানো। সুমনা ব্যাগ রেখে ওড়না সামলে বসে পড়ে তার পাশে।

“তুমি ঠিক আছো তো?”
“হ্যাঁ মা, খুব ভালো আছি।”

ভদ্রমহিলা কিছুটা মেকি রাগ দেখিয়ে বলে,

“বাপের বাড়ি গিয়ে তো মনে নেই আর!”
“আম্মা, মনে পড়ছিলো দেখেই চলে এসেছি।“

শ্বাশুড়ি হালকা হেসে বলেন,
—"তোর ননাস জানিসই তো, এখন হোস্টেলে থেকে পড়ে। এই বাড়িতে আমি একলাই সারাদিন! কারে কি বলি, এইটুকু কাজ নিয়াও প্রাণ যায়।”

সুমনা গম্ভীর হেসে মাথা নাড়ে। আস্তে আস্তে সবজি কাটায় হাত লাগায়। একটু কাঁধে হেলান দিয়ে বলে,
“রাজ কেমন আছে, আম্মা?”

তিনি যেন একটু থমকে যান। ছুরির গতি ধীর হয়ে আসে।
“ছেলেটা তো কেমন জানি বদলে গেলো। সারাদিন কাজ কাজ, আর মুখে একটা কথা নাই। সকালে উঠে খাবার খায়, অফিস যায়। রাতে আসে, আবার খেয়ে শুয়ে পড়ে।”

"আমার সঙ্গে তো এখন আর কথা বলে না। ফোন ধরলেও যেন কেউ বাধ্য হয়ে ধরছে এমন লাগে।”

শ্বাশুড়ি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেন,
“আমারে তো বলেই না কিছু। যেন ছেলেটা বোবা হয়ে গেছো!”

সুমনার চোখের কোণে একটু জল জমে ওঠে, তবে সে নিজেকে সামলায়। চুপচাপ বলে,

“রাজ তো এমন ছিল না। এত বদলে গেল কীভাবে? আমি ভাবতাম, হয়তো দূরত্ব, হয়তো রাগ। কিন্তু এখন তো মনে হয়, সত্যি সত্যি পাল্টে যাচ্ছে ও।

“আমি তো চাই, তুমি থাকো কিছুদিন। এই সময়টা একা থাকাটা ঠিক না। তুমি থাকলে আমারও ভালো লাগবে। আর ওকে একটু বুঝাইও, হ্যাঁ? সংসার একা টানলে চলে?”

সুমনা মাথা নেড়ে বলে,
”আমি চেষ্টা করবো।”

তার পেটের ভেতর বাচ্চাটা যেন নড়েচড়ে ওঠে।
হয়তো ঠিক তখনই, সে নিজেকে মনে করিয়ে দেয়—এই সম্পর্কটা তার একার নয়। এই সন্তানেরও।
তবে রাজ বদলে গেছে—এটা নিশ্চিত।
প্রশ্ন শুধু একটাই নিজের জন্য, না অন্য কারো জন্য? সুমনা যেন হঠাৎই থমকে দাঁড়ায়। এমন কিছু—সে কল্পনাও করেনি। শরীরে ক্লান্তি, মনের ভার, আর গর্ভের ভার মিলিয়ে সে যেন এক নিঃশব্দ ভূমিকম্পের মাঝখানে পড়ে যায়।

তার পরনে ছিলো থিপ্রিস, সেটা বদলে বেশ অনেকদিন পর একটা হালকা গোলাপি শাড়ি পড়ে। সিল্কের মতো নরম বুকের ওপর দিয়ে আঁচল সামান্য আলগা হয়ে নামছিলো। গাল মুখ গুলো একটু ফুলেছে। দেখতে আগের থেকে সুন্দরই লাগছে। একটু বাড়তি ওজন, একটু হাঁটার ভার—সব মিলিয়ে এক মাতৃত্বের নরম ছায়া যেন জড়িয়ে ছিল তাকে । হঠাৎই দরজা ধাক্কার আওয়াজ হয়। সুমনা গিয়ে দরজা খুলে দিতেই রাজ দাঁড়িয়ে। কাঁধে ব্যাগ, চোখে স্পষ্ট বিরক্তির রেখা।

“সুমনা তুমি! এত রাতে! এখানে কেন এসেছো?”

রাজের প্রতিক্রিয়া দেখে সুমনা কি বলবে বুঝতে পারে না। ভেবেছিল রাজ খুশি হবে, উল্টে বিরক্তিকর ছায়া! তবুও সুমনা কিছুটা গুছিয়ে বলার চেষ্টা করে, গলা কাঁপে

“মনটা খারাপ হচ্ছিল। ভেবেছিলাম কয়েকটা দিন একসাথে থাকি। তুমি তো এতদিন আসো না। ভাবলাম তুমি খুশি হবে!”

রাজ একরকম ঠান্ডা শ্বাস ফেলে বলে,

“তোমার মা তো আছেন, খেয়াল রাখার জন্য। আমি একা থাকি, অফিসের পর কাজের টেনশন থাকে, সময় কোথায়? আর তুমি জানো তো, আমি খুব ক্লান্ত থাকি।”

সুমনার ঠোঁট কাঁপে, সে আর কিছু বলতে পারে না। হঠাৎ তার শরীরে হালকা কাঁপুনি শুরু হয়, হয়তো শরীরের ক্লান্তি, কিংবা অন্তরের গভীর শূন্যতা থেকে। একটুও উত্তেজনাই রাজের চোখে। এমনকি সে তাকায়ও না ঠিক করে, যেন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই গর্ভবতী নারীটি তার স্ত্রী নয়, এক আগন্তুক—বাড়ি এসে অপ্রয়োজনে প্রশ্ন করছে, উপস্থিত হয়েছে অনাহূত হয়ে।

“কেন, তুমি খুশি হও নি?”

রাজ আমতা আমতা করে বলে,
“কেনো, খুশি কেনো হবো না?” 
“খুশি হওয়ার নমুনা দেখতেই পাচ্ছি, রাজ! এত দিন পর আমাকে দেখতে পেয়েও একবার জড়িয়ে অব্দি ধরলে না!” 

সুমনার গলা রুদ্ধ হয়ে আসে। রাজ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকে, যেন নিজের মধ্যেই দ্বন্দ্বে জর্জরিত। তারপর এগিয়ে আসে। দুই হাত বাড়িয়ে সুমনাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে। সে জড়িয়ে ধরে ঠিকই। কিন্তু সেই আলিঙ্গনে নেই আগের উষ্ণতা, নেই চেনা আবেগ। যেন একটা দায়—তবুও সেই ছোঁয়া পেয়ে সুমনার নারী মন একটু যেন শান্ত হয়ে যায়। চোখের কোণ থেকে গড়িয়ে পড়া নোনাজল ছোঁয় রাজের কাঁধ। সে চেপে ধরে না, শুধু রাখে—হালকা করে, যেন ধরি-না-ধরি অবস্থায়। সুমনা চোখ বন্ধ করে রাখে। ভেতরে চিনচিনে একটা হাহাকার তবুও প্রশমিত হয় সামান্য। অন্তত এইটুকু স্পর্শ তো আছে এখনো। কিছুক্ষণ পর রাজ আলতো করে বলে,

“তুমি বসো, আমি ফ্রেশ হয়ে আসি।"

সে ব্যাগটা রেখে ধীরে ধীরে ওয়াশরুমের দিকে যায়। হেঁটে যেতে যেতে শার্টটা খুলে ফেলে। ঘাড়ের কাছে ঘাম জমেছে। পিঠে ক্লান্তির রেখা। শরীরটা শুকিয়ে গেছে আগের তুলনায়। 
নারীর ভালোবাসা বড় সহজে হার মানে না। ছোট্ট একটুখানি স্পর্শ, একটুখানি উষ্ণতা—তাতেই সে নিজেকে মেলাতে জানে। আশা বুনতে জানে। ভাঙা হৃদয়ের ভেতরেও সে আশ্রয় গড়ে তোলে। এমনই তো সুমনা—ভালোবাসতে জানে, বিশ্বাস করতেও।

তার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে নরম হতে থাকে।
পেটের ভেতর স্পষ্ট এক কোমল নড়াচড়া অনুভব হয়। মনে হয়,
 “এই যে, আমাদেরই সন্তান। ও কি টের পাচ্ছে না আমার কষ্ট?”

সে নিজের পেটের ওপর হাত রাখে। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। ভেতরে ভেতরে প্রার্থনা করে—
রাজ হয়তো আবার একদিন আগের মতো হয়ে যাবে। সুমনা ধীরে ধীরে শার্টটা তুলে নেয়। রাজ ফ্রেশ হতে গিয়েছে, বাথরুম থেকে ঝরনার শব্দ আসছে। সে শার্টটা নাকের কাছে এনে চুপচাপ গন্ধ নেয়—অভ্যাসবশে। সেই চেনা রাজের ঘ্রাণটা খুঁজছিল। কিন্তু ঠিক তখনই চোখে পড়ে—শার্টের কলারের বাঁদিকে একটুকরো গোলাপি দাগ। খুব স্পষ্ট না হলেও, সুমনার চোখ ফাঁকি যায় না। দাগটা কি লিপস্টিকের?

সে মুহূর্তে তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন চেপে আসে। হৃৎপিণ্ডটা ধাক্কা দিতে থাকে অস্বাভাবিক গতিতে। সে বসে পড়ে বিছানায়। শার্টটা ছড়িয়ে আছে হাঁটুর উপর। চোখে জল আসে—কিন্তু কাঁদে না। মাথায় চিন্তা আসে,

একবার তার মনে হয় জিজ্ঞেস করুক রাজকে, ঝাঁঝিয়ে উঠুক—
“কিসের? ওই দাগ?”
কিন্তু পরমুহূর্তে সে নিজেই নিজেকে সামলায়।
“না, এতদিন রাগ ছিল, দূরত্ব ছিলো। আজ যখন এতদিন পর এক ছাদের নিচে ফিরলো, এখন যদি শুরুতেই এসব বলে, তাহলে তো এই ভাঙা ভাঙা সম্পর্ক আর জোড়া লাগবে না। এতদিন পর ফিরে এসে সুমনা এসবে সময় নষ্ট হউক তা চাইলো না। মনে মনে বুঝ দিলো হয়ত কোনো খাবার বা কিছুর দাগ! সে শার্টটা ভাঁজ করে রাখে। কোনো শব্দ নেই, কোনো প্রশ্নও না।

রাজ ফিরে আসে। মুখে জল, চোখে ক্লান্তি।
সুমনা সেদিনকার মতো কোনো কথায় ঝামেলা বাড়ায় না। শান্তভাবে বলে,
 “খাবে?”

রাজ একবার তার মুখের দিকে তাকালো।

 “হুম,” শুধু এটুকুই বলে।

সুমনা খাবার গরম করে, প্লেট সাজিয়ে দেয়। রাজ খায়—চুপচাপ। না কোনো প্রশংসা, না কোনো কথা।
খাওয়া শেষে রাজ উঠে শুয়ে পড়ে বিছানায়। সুমনা প্লেট গুছিয়ে এসে পাশে শুয়ে পড়ে। এক বিছানায় তবুও মাঝখানে যেন একটা অদৃশ্য দেয়াল।

সুমনা মনে মনে ভাবে—
“এতদিন পর যখন ফিরে এলো, একটু ছুঁয়ে তো দেখতেও পারতো! আগে তো এমন ছিলো না।
আমি পাশ ফিরলেই রাজ টেনে নিতো। ঘুমের মাঝেও হাত রাখতো কোমরে, কাঁধে, কখনো গলায়।
বলতো, ‘তুমি ছাড়া ঘুম আসে না।’ আজ সে ঘুমিয়ে পড়েছে, যেন আমি থেকেও নেই!” 

সুমনা চোখ বন্ধ করে ফেললেও ঘুম আসে না। চোখের কোণে নিঃশব্দে জমে ওঠে জল।
বালিশের কোণা ভিজে যায়—কেউ টের পায় না।
কেউ জানে না। বুকের ভেতরে হাহাকার জমে থাকে। রাজ আজ নিশ্চুপ। নির্লিপ্ত।
দূরত্বের এক ঠান্ডা দেয়ালে ঢাকা পড়ে আছে তাদের ভালোবাসার শেষ রেশটুকু।

সুমনা জানে না, সামনে কি হবে। রাজ কি আগের মতন হবে না? কবে শেষ হবে তার এই ব্যস্ততার লুকোচুরি? কি অপেক্ষা করছে তার জন্য? 
আপাততো, এই রাতে এই নিঃশব্দ ঘরে, সে জানে সে খুব একা। রাজ তার পাশে থেকেও নেই!
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp