“আপনি কি কাজের সূত্রে ঢাকায় একাই থাকেন?”
কিনজা আপনমনে কী যেন ভাবছিল। রাইয়ানের কথায় তার ঘোর কাটে। সে ছোট্ট করে উত্তর দেয়,
“হ্যা”
“কাজের প্রতি আপনার ডেডিকেশন দেখে ভালো লাগল।”
“কাজের বাইরে অন্য কিছু নিয়ে ভাবতেও ইচ্ছা করে না আমার।”
“কেন?”
“কাজের বাইরে আমার নিজের যে একটা জীবন আছে সেই জীবনটা নিয়ে ভাবতে দমবন্ধ লাগে আমার। আমি কাজের মাঝেই শান্তি খুঁজে পাই।”
কিনজার কথাটা রাইয়ান ঠিক বুঝতে পারে না। তাই জিজ্ঞেস করে,
“ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ভাবতে এত অনীহা কেন আপনার?”
“একটা সময়ে মনে হতো আমার বেঁচে থাকার বিশেষ কোনো কারণ নেই। আমি মরে গেলেই শান্তি পাব। পড়াশোনা শেষ করেছি একপ্রকার জোর করেই। এরপর তো কাজে যুক্ত হলাম। প্রতিদিন বিভিন্ন কেস নিয়ে ভাবতে ভাবতে নিজেকে নিয়ে ভাবা বন্ধ করে দিলাম। তখন থেকেই একটু বাঁচার আগ্রহ পেলাম।”
কথা বলতে বলতে প্রথম ভিক্টিম তথা রাফার হোস্টেলের সামনে এসে থামে তারা দু’জন। এরপর আর কোনো কথা হয় না তাদের মাঝে। হোস্টেলে গিয়ে নিজেদের পরিচয় দিয়ে তারা রাফার রুমে চলে যায়। সেখানে আরো দু'জন থাকে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হলে মেয়ে দু'জন জানায়,
“রাফার সাথে আমাদের ভালো বন্ধুত্ব ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই ও কেমন যেন হয়ে যায়। আগে যে মেয়েটা দশ মিনিটের জন্যেও ফোন হাতে নিতো না সেই মেয়েটা সারাদিন, রাত ফোন নিয়ে পড়ে থাকত। কার সাথে যেন কথা বলত ঘন্টার পর ঘন্টা।”
“তোমরা কেউ জানতে চাওনি যে কার সাথে কথা বলত রাফা?”
“জানতে চেয়েছিলাম ম্যাম। কিন্তু রাফা এই প্রশ্নটা এড়িয়ে যেত। শুধু বলত, আমি মনে হয় প্রেমে পড়েছি রে। কিন্তু কার সাথে কথা বলত সেই বিষয়ে কিচ্ছু বলত না।”
মেয়েদের সাথে কথা বলা শেষে কিনজা রাফার জিনিসপত্র সব দেখে। কিন্তু সেখানে তেমন কোনো ক্লু পায় না।
এরপর সেখান থেকে বেরিয়ে পল্লবী নামক মেয়েটার হোস্টেলে চলে যায় তারা। সেখানেও তেমন কোনো ক্লু মেলে না। এভাবেই গরিমা, তনয়া, শ্রুতি, মিঠি, তানিয়া নামক মেয়েগুলোর হোস্টেলেও তার খোঁজ নেয়। কিন্তু কোত্থাও কোনো ক্লু নেই। তবে সবার কথা একটাই, ফোন নিয়ে সারাক্ষণ পড়ে থাকত।
কিনজা গাড়িতে বসে রাইয়ানকে বলে,
“ফোনের বিষয়টাও কমন দেখছি। ফোনগুলো পাওয়া গেলে ভালে হতো। কিন্তু মেয়েদের সাথে সাথে তো তাদের ফোনগুলোও গায়েব।”
“আমাদের আরো ঠান্ডা মাথায় সবকিছু ভাবতে হবে।”
“জি স্যার। আচ্ছা আমরা ওদের কলেজ আর কোচিংগুলোতে যেতে পারি না? হয়তো ওখানে গেলে কোনো ক্লু পাব। এমন কোনো ক্লু পাব যাতে কেসটা সলভ্ করা আমাদের জন্য সহজ হয়ে যাবে।”
“হুম আমিও সেটাই ভাবছি। আমাদের পরবর্তী ডেস্টিনেশন কোচিং সেন্টার। তবে আজ আর আমরা কোথাও যাব না। অফিসে যাই চলুন। বাকি কথা ওখানেই হবে। আমি বাকিদেরও অফিসে চলে আসতে বলেছি।”
“ঠিক আছে স্যার।”
চলতি পথে কিনজা কিছু একটা দেখে হঠাৎই রাইয়ানকে গাড়ি থামাতে বলে। রাইয়ান গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“কী হয়েছে?”
কিনজা হাতের ইশারায় জানালার বাইরে দেখিয়ে বলে,
“হাওয়াই মিঠাই!”
কথাটা বলে কিনজা খুশিমনে গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে হাওয়াই মিঠাই ওয়ালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। তাকে এমন বাচ্চামো করতে দেখে রাইয়ান কিছুটা অবাক হয়। কারণ এই মেয়েকে সে কখনো হাসতে দেখেনি। এই প্রথম কিনজাকে হাসতে দেখে রাইয়ান অবাক হওয়ার সাথে সাথে মুগ্ধও হয়। তার হাসিটা বড্ড সুন্দর। কিনজা হাসলে তার ডান গালে হালকা টোল পড়ে। ডানপাশে একটা গজ দাঁতও আছে। হাসির সাথে সাথে চোখগুলোও ছোটো হয়ে আসে। কিনজাকে দেখতে দেখতে রাইয়ান গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। তারপর গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে হাতগুলো বুকের পাশে আড়াআড়িভাবে রেখে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে হাওয়াই মিঠাই নিতে থাকা মেয়েটার দিকে।
কিনজা দুই হাতে দুইটা হাওয়াই মিঠাই এনে রাইয়ানের সামনে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বলে,
“হাওয়াই মিঠাই খাবেন স্যার?”
রাইয়ান নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বলে,
“আমি চিনি খাই না।”
“একবার মুখে দিয়ে তো দেখুন। এটা এমন এক জিনিস যা মুখের মধ্যে গেলে নিমিষেই মিলিয়ে যায়। একদম হাওয়ার মতো। এজন্যই তো এটার নাম হাওয়াই মিঠাই।”
রাইয়ান আবারো বলে ওঠে,
“উহু আমি খাই না এসব। আপনিই খান।”
“ঠিক আছে।”
কিনজা একটা হাওয়াই মিঠাই রাইয়ানের হাতে দিয়ে বলে,
“আপনি কি এটা একটু ধরে রাখতে পারবেন স্যার?”
রাইয়ান চুপচাপ গোলাপি রঙের হাওয়াই মিঠাই নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আর কিনজা আপনমনে সাদা রঙের হাওয়াই মিঠাই নিয়ে খেতে শুরু করে। এই সময় কিনজার চোখেমুখে যে আনন্দ খেলা করছিল তা দেখে রাইয়ান না চাওয়া সত্ত্বেও কিনজার দিক থেকে চোখ সরাতে পারে না। কী সেই নিষ্পাপ হাসি! নিষ্পাপ চাহুনি!
হাওয়াই মিঠাই খাওয়া শেষে কিনজা রাইয়ানের হাত থেকে বাকি হাওয়াই মিঠাই নিয়ে কৃতজ্ঞতার সুরে বলে,
“ধন্যবাদ স্যার। এখন চলুন যাওয়া যাক।”
রাইয়ান কোনো কথা না বলে গাড়িতে গিয়ে বসে। কিনজাও নিজের সিটে বসে বাকি হাওয়াই মিঠাই খেতে শুরু করে। রাইয়ান সেদিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে গাড়ি স্টার্ট দেয়।
গাড়ি সিআইডি ব্যুরোর সামনে এসে থামলে কিনজা গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। রাইয়ান গাড়ি পার্ক করে অফিসের ভেতরে যেতে ধরলে কিনজা পেছন থেকে ডেকে ওঠে। রাইয়ান থেমে গিয়ে পেছনে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“কিছু বলবেন?”
কিনজা কয়েক পা এগিয়ে এসে ক্ষীণ স্বরে বলে,
“স্যরি স্যার!”
রাইয়ান কিছু বুঝতে না পেরে বলে,
“স্যরি কেন?”
“আপনার সময় নষ্ট করার জন্য।”
“মানে?”
“ঐ যে রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে আমি যে হাওয়াই মিঠাই খাওয়ার জন্য ছুটে গেলাম তার জন্য স্যরি। অন ডিউটি অফিসার হিসেবে এমন কাজ আমাকে মানায় না। আসলে হাওয়াই মিঠাই আমার অনেক প্রিয়। আমি হাওয়াই মিঠাই দেখলে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারি না। আমার ভেতরের বাচ্চা আমি'টা বেরিয়ে আসে তখন। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আমি আমার এমন কাজের জন্য দুঃখিত।”
প্রথমে কথাগুলো বলার সময় কিনজার ঠোঁটের কোণে হাসি থাকলেও শেষের কথাটা বলতে গিয়ে কিনজা মাথা নামিয়ে নেয়। তার কাছে মনে হচ্ছে সে বিরাট বড়ো ভুল কাজ করে ফেলেছে। রাইয়ান সেটা বুঝতে পেরে বলে,
“ইট্স ওকে। ভেতরে চলুন এবার। অনেক কাজ বাকি এখনও।”
কিনজা মাথা নাড়িয়ে ভেতরে চলে যায়। রূপন্তি কিনজাকে দেখে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,
“কিরে এত দেরি হলো তোদের? স্যার কোথায়?”
“আসছে।”
“আচ্ছা তোরা কোনো ক্লু পেলি? আমি আর ফারহান তো কোনো ক্লু খুঁজেই পাইনি ভাই।”
কিনজা ফিসফিস আওয়াজে বলে,
“তোরা ক্লু খুঁজতে গিয়েছিলি না প্রেম করতে গিয়েছিলি? সত্যি করে বল তো।”
রূপন্তি একটু লজ্জা পেয়ে বলে,
“দুটোই!”
·
·
·
চলবে……………………………………………………