দিন গড়িয়ে রাত হয়, মাস গড়িয়ে ক্যালেন্ডারের পাতা বদলায়। কিন্তু লগ্নর রাগ কমে না। একইভাবে ভালোবাসাও কমে না একবিন্দু। সে জীবনের এমন একটা পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে আজকাল শান্তি ছাড়া কিছুই চায় না। অথচ এই অফিসে ট্রান্সফার হওয়ার পর তার জীবনের শান্তিটাই উধাও হয়ে গেল। একদিন সে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলল। জীবন তো একটাই।
সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে খুব সকালবেলা লগ্ন মেট্রো ধরল। সূর্য ওঠেনি তখনো। নাদভির বাসার খুব কাছেই মেট্রো স্টেশন। স্টেশন থেকে হেঁটেই চলে গেল লগ্ন। বরফ পড়ছে, হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। নাহ একটা গাড়ি কিনেই ফেলতে হবে মনে হচ্ছে। দু মাস স্যালারি থেকে কিছু টাকা জমালেই একটা সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি হয়ে যাবে।
লগ্নকে দেখেই সিকিউরিটি গেট খুলে দিলো। লগ্ন বলল, ‘নাদভিকে ফোন করুন।’
সিকিউরিটি বলল, ‘উনি বলেছেন আপনি আসলে যেতে দিতে, ফোন করার দরকার নেই।
লগ্ন নাদভির অ্যাপার্টমেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে বেল বাজাল। নাদভি চোখ কচলাতে কচলাতে ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে লগ্নকে দেখেই চমকে উঠল।
‘এত সকালে তুমি? এই বরফে কীভাবে এলে? আমাকে একটা কল দিলেই তো আমি চলে যেতে পারতাম।
লগ্নর জ্যাকেটের জায়গায় জায়গায় বরফ পড়ে সাদা হয়ে আছে।
নাদভি সরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘তাড়াতাড়ি ভেতরে এসো।’
লগ্ন ভেতরে ঢুকে জ্যাকেটটা খুলে রাখল। নাদভি হিটারের টেম্পারেচার বাড়িয়ে দিলো। তারপর অবাক চোখে চেয়ে রইল। লগ্ন শীতে কাঁপতে কাঁপতে এসে নাদভিকে জড়িয়ে ধরল। নাদভির বুকের সাথে মিশে যেতে যেতে বলল, ‘ক্ষমা করে দিয়েছি।’
এবার নাদভিও লগ্নকে জড়িয়ে ধরল। তারপর ভেজা গলায় বলল, ‘থ্যাংক ইউ লগ্ন। থ্যাংক ইউ সো মাচ।’
তারপর লগ্নকে জ্যাকেট দেওয়ার জন্য সরে যেতে চাইলে লগ্ন ছাড়ল না। নাদভি বলল, ‘তুমি জমে যাচ্ছ। একটা জ্যাকেট দিই।’
লগ্ন এবার নাদভিকে ছেড়ে বলল, ‘না। নিজের সাথে যুদ্ধ করতে করতে সারারাত ঘুমাতে পারিনি। এখন ঘুমাব।’
এরপর লগ্ন নিজেই নাদভির বিছানায় গিয়ে কম্বলের মধ্যে গুটিশুটি হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। নাদভি চেয়ার টেনে পাশে বসল। লগ্নর ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। কতক্ষণ সে জানে না। আজ তার বিশ্বজয় করার দিন। লগ্ন তাকে ক্ষমা করে দিয়েছে!
লগ্ন ঘুম থেকে ওঠার আগেই নাদভি কিছু নাস্তা তৈরি করল। তারপর আবার সেই চেয়ারে গিয়ে বসে তাকিয়ে রইল লগ্নর মুখের দিকে।
লগ্ন প্রায় দুই ঘণ্টা ঘুমাল। ঘুম ভেঙে এই দৃশ্য দেখেই হেসে দিলো। নাদভিও হাসল। লগ্ন উঠে আড়মোড়া ভাঙতেই নাদভি বলল, ‘চলো,
‘চলো, নাস্তা করি। আমি আসলে বাইরেই নাস্তা করি বেশি, তাই বাসায় খুব বেশি কিছু ছিল না। তোমাকে একা রেখে বাইরে যেতেও ইচ্ছে করছিল না। তাই যা ছিল তাই রেডি করেছি।’
লগ্ন বিছানা ছেড়ে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে দেখে অরেঞ্জ জুস, অমলেট, বেকন, পিনাট বাটার টোস্ট, ফ্রুটস দিয়ে টেবিল ভরা। বলল, ‘এতকিছুর পর আবার বলছো কিছু নেই। বাপরে কিছু থাকলে কী বানাতে!’
নাদভি হাসল। লগ্ন হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে খেতে বসলো। নাদভিও খেতে বসল কিন্তু তার চোখ সরে না লগ্নর উপর থেকে। খেতে খেতে লগ্ন জানতে চাইল, ‘কী দেখছ তখন থেকে?’
‘তোমাকে দেখছি। এতদিন লুকিয়ে দেখেছি। এখন তো আর লুকানোর প্রয়োজন নেই।’
লগ্ন হেসে বলল, ‘তুমি জানো, কেন আমি তোমাকে ক্ষমা করেছি? তোমার ভালোবাসা দেখে নাকি তোমার অনুশোচনা দেখে নাকি অন্যকিছু?’
নাদভি একটু ভেবে বলল, ‘সম্ভবত এসবের কোনোটিই না। ক্ষমা করেছ, তুমি আমাকে ভালোবাসো বলে।’
লগ্ন মাথা নেড়ে বলল, ‘ভালোই চিনেছ দেখছি।’
নাদভি হাসল। তারপর বলল, ‘তোমার রাগ কমেছে? ‘না।’
‘তাহলে রাগ মিটিয়ে নাও। ভালো লাগবে।’
‘কীভাবে?’
তুমি যেভাবে চাও। খামচে, কামড়ে কিংবা চাবুক মেরে।’
লগ্ন এবার হো হো করে হেসে দিলো। তারপর বলল, ‘ঠিক আছে ভেবে দেখি কী করা যায়।’
·
·
·
চলবে........................................................................