লগ্নর ঘুমের রুটিন এলোমেলো হয়ে গেছে। রাতে একদমই ঘুম হয় না, দিনে কখনো হয়, কখনো হয় না। চোখের নিচে কালি তো তার আগেই ছিল। সেটা এখন বেড়েছে। মুখে প্রচুর পরিমাণে ব্রণ উঠতে শুরু করেছে।
সারারাত না ঘুমিয়ে প্রচণ্ড ক্লান্ত লাগছিল। ক্লান্তি কাটাতেই চা বানিয়ে নিজের বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিল। এমন সময় বিলকিস বেগম এসে বললেন, ‘খালি পেটে চা খাচ্ছিস, নাস্তা তৈরি হয়ে গেছে। কিছু একটা খেয়ে নে।
লগ্ন বলল, ‘মাত্র উঠেছি। ক্ষুধা নেই। কিন্তু চা জরুরি। নাস্তা একটু পরে করছি।’
বিলকিস বেগম আর কিছু বললেন না। চলে গেলেন স্বামীকে নাস্তা দিতে। ছুটা বুয়া ঘর মুছছিলেন।
সে হঠাৎ বলে বসল, ‘ভোক কেমন করি লাগিবি বুবু! যা হইল তোমাঘরের সাথত! পুরুষ মানুষ আসেই জীবনডা তছনছ করিবার তনে। আহারে কী সুন্দর মেয়ে! কাঁয় বুঝা পাইছিলো এমন হবি।’
লগ্ন চিৎকার করে মাকে ডাকল। বিলকিস বেগম এসে বললেন, ‘কী হলো?’
‘আজ থেকে আমার ঘরে বাইরের কেউ যেন না আসে। আমার ঘর আমি নিজেই পরিষ্কার করতে পারব।’
বিলকিস বেগম অবাক হয়ে বুয়ার দিকে তাকাল। বুয়ার ঘর মোছা প্ৰায় শেষ। সে ঝড়ের বেগে বাকিটা মুছে বের হয়ে গেল। বিলকিস বেগম বললেন, ‘কী করেছে ও?
‘আমার স্বামী আমার গয়নাগাটি নিয়ে পালিয়েছে এই ঘটনাটা ছাড়া জন্মের পর তো আমার জীবনে আর কিছু ঘটেইনি মা। সেটা নিয়েই হাহুতাশ করছিল।’
বিলকিস বেগম করুণ মুখে চেয়ে রইলেন। লগ্ন আবার তার চায়ে মনোযোগ দিলো।
লগ্নর সাথে যা ঘটেছে তারপর তার জন্য সামলে ওঠা খুবই কঠিন, তবে সে চেষ্টা করে যাচ্ছিল। কিন্তু মূল সমস্যাটা শুরু হলো বন্ধ ঘর থেকে বের হওয়া শুরু করতেই। যার সাথেই দেখা হয় সেই তার দুঃখে আহা উঁহু করে। যতই সে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চায়, ততই তার আশেপাশের মানুষ বিষয়টিকে উন্মোচিত করতে পছন্দ করে। বাড়িতেও যে খুব শান্তি আছে তা নয়। যেই আসবে সেই আফসোস করবে। আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে দুধওয়ালা কিংবা কাজের লোক-প্রত্যেকে ওই একটি ঘটনা নিয়ে পড়ে রয়েছে। যেন ওই দুর্ঘটনা ছাড়া লগ্নর জীবনে আর কোনোকিছুর অস্তিত্ব নেই। দমবন্ধ করা অনুভূতি হতে লাগল তার। একদিন সহ্য করতে না পেরে বাবার কাছে গেল। তিনি বাজারের লিস্ট তৈরি করছিলেন। লগ্ন বলল, ‘বাবা, তোমার সাথে আমার জরুরি কথা আছে।’
আতিকুর রহমান লিস্ট থেকে চোখ তুলে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ মা, বল কী বলবি।’
‘আমি যত দ্রুত সম্ভব বাইরে পড়তে যেতে চাই। তুমি ব্যবস্থা করে দাও।’
এবার আর আতিকুর রহমান মানা করতে পারলেন না। কীভাবে করবেন! মেয়ের সাথে সবার অমানবিক আচরণ তো নিজ চোখেই দেখছেন। বিলকিসের মুখেও শুনেছেন। মেয়ের সুখের জন্যই তো সব করেছেন। কিন্তু হলো উলটোটা!
লগ্ন পুরোদমে আইইএলটিএসের প্রস্তুতি নিতে লাগলো। তাকে ভালো একটা স্কোর করতেই হবে। নিজে নিজেই প্রতিদিনের পড়াশোনার একটা পরিকল্পনা তৈরি করে নিল। একটু আগে আগেই রেজিস্ট্রেশন করে নেবে ভেবে রেজিস্ট্রেশন করতে চলে গেল। যেদিন রেজিস্ট্রেশন করতে গেল সেদিন ঘটল আরেকটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। পে করার সময় পার্স খুলে তার ক্রেডিট কার্ডটা আর খুঁজে পেল না। ব্যাংকে গিয়েও পোহাতে হলো নানান ঝামেলা। তারপর একসময় সে বুঝতে পারল ইফতি অর্থাৎ নাদভি যাওয়ার সময় তার ক্রেডিট কার্ডটিও নিয়ে গেছে। তার ক্রেডিট কার্ডের লিমিট এক লাখ। সেই টাকাটাও তুলে নিতে ভুল করেনি। মেসেজ চেক করে দেখল, যে রাতে ওরা পালিয়েছিল সেই রাতে তার কাছে মেসেজও এসেছিল কিন্তু ঘুমের ওষুধের ইফেক্টে মরার মতো ঘুমাচ্ছিল। পরদিন সকালে এতবড় ধাক্কা সামলাতে গিয়ে মেসেজ খেয়াল করা হয়নি। কিন্তু পিন কীভাবে জানল? তারপর মনে পড়ল বিয়ের শপিংয়ের সময় অসংখ্যবার লগ্ন নাদভির সামনেই পিন ব্যবহার করেছে। হয়তো কখনো আড়চোখে দেখে নিয়েছে। নিজের মনেই হাসল লগ্ন।
·
·
·
চলবে........................................................................