আসার সময় লগ্ন-নাদভি ব্যানফ হাইকিং ম্যাপ এবং গাইডবুক কিনে এনেছিল। পরদিন সকালে সেগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল তারা। আজকের গন্তব্য বো ফলস। ম্যাপ ও গাইডবুক দেখে সারাদিনের পরিকল্পনা সাজিয়ে নেয়া হয়ে গেলে দুজন মিলে বার্গার তৈরি করতে বসলো। যেহেতু সারাদিনের পরিকল্পনা তাই দুপুরের খাবারটা সাথে করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সঙ্গে কিছু ফল নিল ছোট ক্ষুধার জন্য।
ব্যানফ থেকে হাইকিং করে বো ফলসে পৌঁছতে হবে। বো নদীর পাশে ট্রেইল তৈরি করা আছে, সেটা ধরেই তারা হাঁটছিল। দুজনের কাঁধেই ব্যাগ। ব্যাগে খাবার, পানিসহ সারাদিনের জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। নদীর ওপাড়ে তাকালে প্রথমে সবচেয়ে উঁচুতে দেখা যায় ঝকঝকে নীল আঁকাশ। তার নিচে ছোট-বড় পাহাড়, সামনে সবুজ পাইন গাছ, তার নিচে নীলচে সবুজ পানির স্রোতসিনী বো নদী। আঁকাশ থেকে শুরু করে নদী পর্যন্ত কী অপূর্ব রঙের খেলা। হাঁটতে হাঁটতে মনে হয় দাঁড়িয়ে পড়ি, চুপচাপ উপভোগ করি। কিন্তু তাদের গন্তব্য যে আরো সুন্দর জায়গা!
হাঁটতে হাঁটতে নাদভি একসময় বলল, ‘বো নদীর ট্রেইল এত সুন্দর, ফলস পর্যন্ত না যেতে পারলেও আক্ষেপ থাকবে না।’
লগ্ন বলল, ‘আমার থাকবে। বো ফলস দেখার জন্যই এত কষ্ট করে এতটা পথ হাঁটছি।’
নাদভি হাসতে হাসতে বলল, ‘একটু হাঁটাহাঁটির অভ্যাস রেখো। তাহলে এত অল্প হেঁটেই ক্লান্ত হয়ে পড়বে না।’
লগ্ন বলল, ‘ওমা প্রতিদিন মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত কে হাঁটতো? এখন তুমিই তো আমাকে গাড়ি করে অফিস নিয়ে এসে অলস বানিয়েছো। আমি নিশ্চিত যখন আমি মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত হাঁটতাম তখন এলে আমার হাঁটতে এতো কষ্ট হতো না।’
নাদভি হেসে বলল, ‘অফিস টাইমে আর অফিস শেষে হেঁটে কষ্ট করার দরকার কী? অন্য সময়ে হাঁটবে। আমি যেমনটা করি।’
লগ্ন ভেংচি কেটে বলল, ‘তোমার মতো অত আলগা তেল নেই আমার গায়ে।’
লগ্ন এক জায়গায় বসে পড়ে বলল, ‘দাঁড়াও একটু বসে যাই।’
নাদভি দাঁড়ালো। লগ্ন পানি খেল। তারপর একটা এনার্জি বার খেয়ে আবার হাঁটা শুরু করলো।
দূরে বো ফলস দৃশ্যমান হতে না হতেই পানির শব্দ শোনা গেল। কি অদ্ভুত প্রকৃতির সঙ্গীত! ঝর্নার এই সঙ্গীতের নেশায় যে একবার পড়েছে সে কখনও এই নেশা ছাড়াতে পারে না। লগ্নরও হয়েছে সেই দশা!
বো ফলসের পানি মাত্র ৩০ ফিট উপর থেকে পড়ে। প্রস্থ ১০০ ফিট। কিন্তু এর সৌন্দর্য বর্ণনাতীত। ফলসের একপাশে বড় পাহাড় আরেক পাশে ট্রেইলের পাশেই খাঁজকাটা ছোট পাহাড়।
এখানে অনেক রকম অ্যাক্টিভিটি আছে। লগ্ন-নাদভি বেছে নিল রাফটিং। রাফটিংয়ে দুজনেই নতুন। কিন্তু দারুণ অভিজ্ঞতা হলো। কী ভয়ংকর সব স্রোত পেরিয়ে গেল! প্রথমদিকে মনে হচ্ছিল রাফটিং বোট উলটে পড়ে যাবে। কিন্তু পড়লো না। এরপর খুব দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে গেল। তখনই আসল মজাটা শুরু হলো।
রাফটিং শেষে দুজনে জামাকাপড় পালটে লাঞ্চ করতে বসলো। খেতে খেতে নাদভি বলল, ‘আমার জীবনের বেস্ট একটা এক্সপেরিয়েন্স ছিল এটা।’
লগ্ন বলল, ‘আমারও। থ্যাংক ইউ সো মাচ। তুমি না থাকলে এটা সম্ভব হতো না।’
নাদভি হেসে বলল, ‘আমার ক্ষেত্রেও তাই। তুমি না থাকলে তো এখানে আসাই হতো না।’
লগ্ন এবার দুষ্টুমি করে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি না থাকলে আর কী কী হতো না বলো তো?’
নাদভি হেসে বলল, ‘সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার ড্রাইভ করে আসা হতো না। ব্যানফ দেখা হতো না। হট স্প্রিংয়ে সাঁতার কাটা হতো না। কাঠ কাটা হতো না। আর…’
‘আর?’
‘আর মুগ্ধ চোখে ঘুমন্ত পরি দেখা হতো না!
চমকে তাকালো লগ্ন। নাদভি চোখ সরিয়ে নিল।
·
·
·
চলবে.........................................................................