প্রথম মাসের বেতন পেয়েই লগ্ন সান ফ্রান্সিসকোর টিকিট কাটল। গিয়ে কোনো লাভ নেই, এ ব্যাপারে সে পুরোপুরি নিশ্চিত তবুও যেতে ইচ্ছে করছে। পার্শ্ববর্তী স্টেট তাই যাতায়াত খরচ কম, যদিও এই কমটাও এই মুহূর্তে তার জন্য অনেক। টাকা জমিয়ে সেমিস্টার ব্রেকে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সময়টাও কাজে লাগানো যেত আবার ঘুরতেও পারত। কিন্তু সে তো লগ্নজিতা, এখনই সে যাবে। এই যাওয়া আটকানোর সাধ্য তার নেই।
যেদিন ক্লাস নেই সেদিন বেকারি থেকে ছুটি নিয়ে রওনা হলো সান ফ্রান্সিসকো। আজকের রাতেই ফিরতি টিকিট কাটা। সকালের ফ্লাইট ছিল, এগারোটা নাগাদ পৌঁছে গেল। এয়ারপোর্টে নেমে সোজা চলে গেল মাইক্রোসফটের অফিসে। সেখানে গিয়ে রিসিপশনে ইফতেখার মাহমুদের সাথে দেখা করতে চাইল। রিসিপশনিস্ট ইফতেখার মাহমুদকে ফোন দেওয়ার আগে লগ্নর পরিচয় জানতে চাইলে লগ্ন বলল, ‘বলুন সিয়াটল থেকে একজন বাংলাদেশি দেখা করতে এসেছেন।’
রিসিপশনিস্ট তাকে ওয়েটিং রুমে বসতে বলল।
কিছুক্ষণের মধ্যে ইফতেখার মাহমুদ ওয়েটিং রুমে এলেন। লগ্নকে দেখে তিনি চিনতে পারলেন না। বললেন, ‘হাই, আমি ইফতেখার মাহমুদ। কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?’
লগ্ন বলল, ‘আমি লগ্নজিতা। আপনাকে একেবারেই অযাচিতভাবে একটু বিরক্ত করতে হচ্ছে বলে আমি দুঃখিত।’
ইফতেখার মাহমুদ শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। চেনে না জানে না মেয়েটা কী যে বলছে তার মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে।
সে বলল, ‘কী বিষয়?’
লগ্ন খানিক ইতস্তত করে তারপর বলল, ‘কয়েক মাস আগে বাংলাদেশে আমার বিয়ে হয়। একটা প্রতারক চক্র আপনার নাম পরিচয় দিয়ে, আপনার ঠাকুরগাঁওয়ের বাসা ভাড়া করে খুবই সুনিপুণভাবে ঘটনাটা ঘটায়। বিয়ের পরদিন ৩০ ভরি সোনার গয়না ও টাকাপয়সা যা পারে নিয়ে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে পুলিশের কাছে আমরা জানতে পারি ওরা একটা প্রতারক চক্র।’
ইফতেখার মাহমুদ অবাক হয়ে বলল, ‘বলেন কী! বাসা ভাড়া নিয়ে একটা পুলিশি ঝামেলা হয়েছিল শুনেছিলাম। আমাদের কেয়ারটেকারের জেলও হয়েছে। ওসব আমার বাবা হ্যান্ডেল করেছেন। কিন্তু আমার নাম পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে এমন কিছু শুনিনি।’
‘আপনি ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান থেকে পড়াশোনা করেছেন না?’
‘হ্যাঁ।’
এবার আরেক দফা অবাক ইফতেখার। লগ্ন বলল, ‘আপনার পড়াশোনা, চাকরি, পরিচয়, সবকিছুই প্রতারক ছেলেটি ব্যবহার করেছে। আর একারণেই বিয়ের আগে যখন আমার পরিবার পাত্র সম্পর্কে খোঁজখবর করেছে তখন সব ভালোই জানতে পেরেছে। কারণ সবাই তো আপনার ব্যাপারে বলেছে। আমার পরিবার কাউকে ছবি দেখিয়ে খোঁজ নেয়নি, এটা অবশ্য তাদের ভুল ছিল। যাই হোক এবার আসল কথায় আসি, প্রতারক ছেলেটি সান ফ্রান্সিসকো মাইক্রোসফটে কাজ করে বলেছিল বলেই আপনাকে পাওয়ার একটা ক্লু পাই আমি। তাই এখানে আসা। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে যে মানুষ আপনার সম্পর্কে এত কিছু জানে সে কোনো না কোনোভাবে আপনার পরিচিত হতে পারে। পুলিশ মারফত জানতে পারি ছেলেটির আসল নাম নাদভি আহমেদ
ইফতেখার এবার বললেন, ‘এই নামে তো কাউকেই মনে করতে পারছি না। আপনার কাছে ওর কোনো ছবি আছে?’
‘জি।’
লগ্ন মোবাইল বের করে ছবি দেখাল। ছবি দেখে ইফতেখার ভ্রু কুঁচকে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, ‘লগ্নজিতা, আমি ওনাকে ঠিক চিনতে পারছি না। আবার খুব পরিচিতও লাগছে। এই পরিচিত লাগাটাই অস্বস্তি দিচ্ছে।’
লগ্ন বলল, ‘আপনি একটা ছবি রাখুন। ওর আসল ন্যাশনাল আইডি কার্ডের একটা কপি আছে আমার কাছে। পুলিশ বের করেছে। সেটাও এক কপি এনেছি। সেখানে ওর বাবা-মায়ের নাম, ঠিকানা এসব আছে। যদি কখনো কিছু মনে পড়ে। যেহেতু আপনার পরিচিত লাগছে তাই বলছি।’
‘হ্যাঁ, প্লিজ। আপনি আপনার ফোন নম্বর দিয়ে যান। কখনো কিছু যদি মনে পড়ে বা বের করতে পারি আপনাকে আমি জানাব।’
লগ্ন নাদভির ছবি, ন্যাশনাল আইডি কার্ডের কপি এবং নিজের ফোন নম্বর দিয়ে বিদায় নিল। ততক্ষণে দুপুর হয়ে গেছে। লাঞ্চ করে চলে গেল বেকার বিচে। এই বিচের কথা সে নকল ইফতেখার অর্থাৎ নাদভির মুখে অনেকবার শুনেছে। বিচে গিয়ে তার মনে হলো নাদভি কখনো একবার হলেও এই বিচে এসেছে। নাহলে ওইভাবে বর্ণনা করা সম্ভব না। তার মানে কি সান ফ্রান্সিসকোর সাথে ওর কোনো যোগাযোগ আছে?
·
·
·
চলবে.........................................................................