শিকদার সাহেবের দিনলিপি - পর্ব ১৭ - মৌরি মরিয়ম - ধারাবাহিক গল্প


          আমি কিছু বুঝি আর না বুঝি এটা বুঝে গেছি যে আমার পড়াশোনা আর হবে না। এই অবস্থায় প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির খরচ চালানো একেবারেই অসম্ভব। রাহির পড়াশোনাও হয়তো খুব বেশি দূর হবে না। তবুও, অন্তত এইচএসসি পরীক্ষাটা দেয়া উচিত। বাবা-মায়ের ঘরের ফার্নিচার আর টিভিটা বিক্রি করে দিলাম। আপাতত এই জিনিসগুলো কোনো কাজে দিচ্ছে না। রূপ অবশ্য টিভি দেখে, তবে ওকে কম্পিউটার ছেড়ে দিলেও হবে। পুরনো জিনিসের খুব একটা চাহিদা নেই, ফার্নিচারের কেমন দাম হতে পারে সে বিষয়েও কোনো আইডিয়া নেই। ঠকলাম কি না তাও জানি না। রাহির ফর্ম ফিলাপের পর মোটামুটিভাবে মাসখানেক চলার মতো টাকা হাতে রইল। এভাবে জিনিসপত্র বিক্রি করে করে আর কতদিন চলবে? আমি বুঝতে পারছি পড়াশোনা যতদূর করেছি তাতে কোনো চাকরি পাওয়া সম্ভব না। আমার কোনো কাজ করতে হবে কিন্তু কি কাজ করব বুঝি না। কোনো কাজ করার যোগ্যতাই তো আমার নেই।

রাফসান শিকদার
১৩ ডিসেম্বর, ২০১০

হাতে কিছু টাকা আসায় ঢাকা ছুটলাম। এই টাকায় আমার হিসেব করে চলার কথা। কিন্তু মনকে মানাতে পারলাম না। চলে গেলাম। মীরা আমার কাঁধে মাথা রাখল। আমার হাত দুটো চেপে ধরে বলল, সব ঠিক হয়ে যাবে। বিশ্বাস কর বকুল, আমার সত্যিই মনে হলো সব ঠিক হয়ে যাবে। ওর কাছে এলে যে আমি এত শান্তি পাব তা আগে বুঝিনি। এত শান্তি ওর দুচোখে, ওর হাসিতে, ওর স্পর্শে! এত তীব্রভাবে কবে ভালোবাসলাম ওকে আমি?

রাফসান শিকদার
১৮ ডিসেম্বর, ২০১০

এই অংশটা পড়ে মীরার চোখে জল এসে গেল। ভাবতেও অবাক লাগছে ওই সময় রাফি তাকে এইভাবে ভালোবাসত, অথচ সে এক মুহূর্তের জন্য টের পায়নি!

পরের পাতা…

ইদানীং আমি মেজাজ ধরে রাখতে পারছি না নাকি আমার সঙ্গে বিরক্তিকর ঘটনাগুলো বেশি বেশি ঘটছে? আজ টগর এসেছিল বাসায়। আমার কাছে গাছ কিনতে চায়। কত বড় সাহস ওর-আমি ভেবেই পাচ্ছি না। আমি কি গাছ বিক্রি করতে চাইছি নাকি যে ও কিনবে? হাতি বিপদে পড়লে চামচিকাও লাথি মারে! আমার হয়েছে সেই দশা। সেদিন এতগুলো পেয়ারা কেনার উদ্দেশ্য আজ পরিষ্কার হয়ে গেল।

রাফসান শিকদার
২১ ডিসেম্বর, ২০১০

কেন যেন এবার শীতে আমার কোনো সবজির তেমন ভালো ফলন হচ্ছে না। কিছু সবজিগাছ মরে যাচ্ছে। কিছু পোকায় খেয়ে শেষ করে দিচ্ছে। আমি সম্ভবত ভেতর থেকে ভেঙে গেছি। গাছগুলোর ঠিকঠাক যত্ন নিতে পারছি না হয়তো। গাছগুলো দেখে মনে হলো, ওদের মতোই আমি মীরারও যত্ন নিতে পারছি না এখন। এই সম্পর্কটারও কি তবে শেষমেশ গাছগুলোর মতোই অবস্থা হবে? এসব একদম ভাবতে পারি না আমি। কেন এসব ভাবনা আমার মাথায় আসে?

রাফসান শিকদার
২৫ ডিসেম্বর, ২০১০

ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করতে করতে সব শেষ করে দিচ্ছি। আমি জানি এটা ঠিক হচ্ছে না। এসব না করে একটা কাজ জোগাড় করা দরকার। এসব ভাবতে ভাবতেই একটা কথা মনে পড়ল। কার থেকে শুনেছিলাম মনে নেই তবে শুনেছি বিভিন্ন গার্মেন্টস আর ফ্যাক্টরিগুলোতে প্রায় সময়েই শ্রমিকের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থাকে। ভাবলাম গায়ে শক্তি তো কম নেই নিশ্চয়ই পারব। চেষ্টা করে দেখি পাওয়া যায় কি না।

আশপাশের বেশির ভাগ ফ্যাক্টরিতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছিল কিন্তু আমি নাকি বিদেশি তাই এসব কাজ পারব না! প্রত্যেকে তাই বলল। হায় আল্লাহ! কেন এমন চেহারা দিলে যে চেহারার জন্য একটা কাজও জোটাতে পারি না? এই চেহারায় হয়তো শুধু মেয়ে জোটানো সহজ।

রাফসান শিকদার
২০ জানুয়ারি, ২০১১

আজকাল কিছু লিখতেও বড় ক্লান্তি লাগে! সুখের গল্প লেখায় বড় সুখ। কষ্টে গল্প লেখায় বড় কষ্ট। আমার জীবনের সুখের কোটা পূর্ণ হয়ে গেছে কিনা জানি না তবে কষ্টের কোটা এখনো অনেক বাকি এ ব্যাপারে কোনো দ্বিধা নেই।

রাফসান শিকদার
২২ জানুয়ারি, ২০১১
·
·
·
চলবে.....................................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp