ঘুম থেকে উঠে নিকিতার মিসড কল দেখে কলব্যাক করলেন। নিকিতা সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। শ্বশুরের ফোন পেয়ে আবারও কেঁদে ফেলল সে। বলল, ‘বাবা, আমার ঘরের দরজাটা বাইরে থেকে লাগানো। একটু খুলে দিন প্লিজ।’ বাবর খান বুঝতে পারলেন কোনো একটা সমস্যা হয়েছে। ফোনে কথা না বাড়িয়ে তিনি গিয়ে নিকিতার ঘরের দরজা খুলে দিলেন। অবশ্য সকাল সকাল এমন কান্নাকাটি দেখে তিনি কিছুটা ঘাবড়ে গেলেন, কী ব্যাপার? কী হয়েছে? এভাবে কাঁদছ কেন?
‘বাবা, আপনার ছেলে কোথায় যেন চলে গেছে। ওর ফোনটাও বন্ধ পাচ্ছি।’
‘কোথায় আর যাবে? অফিস করে চলে আসবে দেখো।
‘বাবা, ও শুদ্ধকে সাথে নিয়ে গেছে।
এবার চমকে উঠলেন বাবর খান। খেয়াল করলেন শুদ্ধ তার বিছানায় ছিল না। তিনি উদ্বিগ্ন গলায় জানতে চাইলেন, হুট করে চলে গেল? তোমার সাথে রাগারাগি হয়েছিল?
নিকিতা মাথা নিচু করে বলল, হ্যাঁ, বাবা। রাগ করেই তো চলে গেল। ও-ই তো আমাকে আটকে রেখে গেছে।
নিকিতা বুঝতে পারছে না শ্বশুরের মনোভাব।
বাবর খান কবিরকে ফোন করলেন। কবিরকে প্রায় গত পাঁচ বছর আগে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন তিনি। উল্টোপাশের বাসায় তাকে একটা ফ্ল্যাটও দিয়েছেন থাকার জন্য, যাতে সারাক্ষণই প্রিয়র ওপর নজর রাখা সম্ভব হয়। এই পাঁচ বছরে প্রিয়কে ফলো করে সব খবরাখবর বাবর খানকে দিয়েছে সে। কবির ঘুমিয়ে ছিল। মন্ত্রী সাহেবের ফোন পেয়ে তড়িঘড়ি করে উঠল। ফোন ধরতেই বাবর খান জিজ্ঞেস করলেন, ‘কবির, প্রিয় কোথায়?
‘ঘুমুচ্ছে স্যার।
‘তাহলে শুদ্ধ কোথায়?
‘সেও হয়তো ঘুমুচ্ছে স্যার। তবে আজ প্রিয় স্যারের ঘরে ঘুমোন নি। তিনি। কেন স্যার কী হয়েছে?
‘তোমার এত বড় সাহস, তুমি আমাকে প্রশ্ন করছ? তোমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল প্রিয়র ওপর দিনরাত নজর রাখার জন্য।
‘মাফ করবেন, স্যার। আমি তো তা-ই করছি, স্যার। কোনো ভুল হয়েছে আমার?
‘কালকে রাতে প্রিয় শুদ্ধকে নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে। আর তুমি বলছ সে ঘুমুচ্ছে? এ রকম আন্দাজে কথা বলার সাহস হয় কী করে তোমার? মাস গেলে তো মোটা অঙ্কের টাকাটা নাও, কাজটা ঠিকভাবে করছ না কেন?’
‘সরি স্যার। আমি তো ঠিকই নজর রেখেছি। প্রিয় স্যার তো সন্ধ্যাবেলা বাসায় ঢুকেছে। ওনার গাড়িটা তো এখনো গ্যারেজে।
‘তাহলে গাড়ি নিয়ে যায় নি।
‘কিন্তু স্যার, কখন গেল, আমি তো সারাক্ষণই নজর রাখছি।
‘খবরদার, আমাকে প্রশ্ন করবে না। এক্ষুনি প্রিয়কে খুঁজে বের করো। গাড়ি যখন নেয় নি খুব বেশিদূর যেতে পারে নি। প্রিয়কে খুঁজে বের করতে না পারলে তোমার লাশও কেউ খুঁজে পাবে না।
‘প্রথমে আন্দাজে ঘুমুচ্ছে বলেছি বলে মাফ করবেন, স্যার। আসলে প্রিয় স্যার তো অনেক দিন ধরেই পেট্রার সাথে দেখা করে না। স্বাভাবিক আছে, তাই আমি ভেবেছি বুঝি সব ঠিকই আছে। আমি এক্ষুনি সব খবর আপনাকে দিচ্ছি, স্যার। আপনি চিন্তা করবেন না।’
‘আমার মাথা গরম কোরো না, কবির। এক্ষুনি কাজে নামো।
‘জি স্যার।
ফোন রেখেই বাবর খান নিকিতার দিকে বিক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী নিয়ে রাগারাগি হয়েছিল তোমাদের?
নিকিতা মাথা নিচু করে বলল, আসলে আমি একটা ভুল করেছিলাম, বাবা। তাতেই ও রেগে যায়।’
‘কী করেছিলে, সেটাই তো জানতে চাচ্ছি।
নিকিতা মাথা নিচু করে সব বলে দিল। বলতে বলতে কাঁদছিল। শ্বশুরের দিকে তাকাতে লজ্জা, ভয় দুটোই লাগছিল। সব শুনে বাবর খান হুংকার দিয়ে উঠলেন, ‘তোমার মাথায় কি ঘিলু নেই? এটা কেন করতে গেলে? তুমি জানো তুমি কী করেছ? তোমার বাবার ধৈর্যশীলতায় মুগ্ধ হয়ে তোমাকে বউ বানিয়ে এনেছিলাম। ভেবেছিলাম তুমি তোমার বাবার মতোই হবে। তা না হলে তোমাদের মতো ঘরে আমার ছেলের বিয়ে কখনোই করাতাম না। অথচ এখন দেখছি তুমি সম্পূর্ণ উল্টো, গর্দভ মহিলা! দেখছ তো আমি সবটা হ্যাঁন্ডেল করছি। এর মধ্যে তোমার এই গাধামিটা না করলে হতো না? তোমাকে এক শ বার বলেছি, প্রিয়-পেট্রার কোনো যোগাযোগ নেই, তাহলে তোমার এত জ্বলছে কেন?
নিকিতা আর কিছু বলার সাহস পেল না। বাবর খান আবার বললেন, ‘পেট্রার মা মারা যাওয়ার পর প্রিয় গিয়েছিল, তা নিয়েই কি তোমার এত ক্ষোভ?
নিকিতা চুপ করে রইল। উনি বললেন, ‘শত্রু মারা গেলেও সেখানে যেতে হয়। আর প্রিয়র প্রাক্তন স্ত্রীর মা মারা গেছে, ও যাবে না? সে তো সেখানে প্রেম করতে যায় নি! বোকামি কমাও, না হলে তুমিও ডুববে, আমাকেও ডোবাবে। প্রিয় অন্যসব ছেলেদের মতো না। চরম ঘাড়ত্যাড়া সে। যাও চোখের সামনে থেকে দূর হও।’
কবির কিছুই করতে পারছে না। প্রিয়র মোবাইল বন্ধ। তাকে ট্রেস করা সম্ভব হচ্ছে না। টেনশনে আছেন বাবর খান। অনেক চিন্তাভাবনার পর পেট্রাকে ফোন করলেন তিনি। পেট্রা তার নম্বর দেখে একটু অবাক হলো। এই নম্বর তিনি কোথায় পেলেন? অবশ্য তাঁর মতো মানুষের পক্ষে সবই সম্ভব।
সব শুনে পেট্রা বলল, ‘আঙ্কেল, আমি সত্যি বলছি, আমি কিছু জানি না। আপনার ছেলের ওপর সব দাবি তো ছেড়েই দিয়েছি। আমি যে তার কোনো খোঁজখবর রাখি না, এটা আপনার জানার কথা।
‘আমি জানি, পেট্রা। তবু যেহেতু শুদ্ধকে নিয়ে গেছে, তাই তোমার সাথে যোগাযোগ করতেও পারে। সে জন্যই জিজ্ঞেস করা।
‘করে নি। যদি করে, আমি আপনাকে জানাব।’
‘দেখো, কোনো কিছুই তো গোপন থাকবে না। তাই পরে যদি জানতে পারি তোমার সাথে যোগাযোগ করেছে, তার ফল কিন্তু কারও জন্যই ভালো হবে না।’
‘জি আঙ্কেল, আপনার আর কোনো থ্রেট থাকলে তাড়াতাড়ি দিয়ে শেষ করুন, প্লিজ। আমি অফিসে কাজ করছি।
বাবর খান আর কিছু বললেন না। মেজাজ খারাপ করে ফোন রেখে দিলেন। ওদিকে পেট্রা প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। প্রিয় কোথায় গেল ছেলেটাকে নিয়ে? আর কোনো কাজে মনোযোগ দিতে পারল না সে।
—————
শুদ্ধ ঘুম থেকে উঠে দেখল, সে খুব বড় এবং সুন্দর একটা ঘরে শুয়ে আছে। পাশে বাবা ঘুমাচ্ছে। নিঃশব্দে এসি চলছে। শুদ্ধ চারপাশে সবকিছু দেখতে লাগল। ঘরটা খুব সুন্দর করে সাজানো। বেড, বেড কভার, কম্বল, বালিশ, আলমারি, সোফা, পর্দা–সব সাদা রঙের। তার মনে পড়ল কাল রাতে সে দাদার সঙ্গে ঘুমিয়েছিল। এখানে কী করে এল? এটা কাদের বাসা? যাদের বাসাই হোক, বাবা যখন সঙ্গে আছে, চিন্তা নেই। শুদ্ধ বিছানা থেকে নেমে বাথরুমে গেল। বাথরুমটা দেখে সে খুব অবাক হলো। তার ধারণা ছিল, তাদের ঘরের বাথরুমটাই সবচেয়ে সুন্দর। কিন্তু তার ধারণা ভুল প্রমাণিত করেছে এই বাথরুমটা। এটা ওদেরটার চেয়েও সুন্দর। বেসিনের ওপর দেখতে পেল দুটো নতুন ব্রাশ, নতুন টুথপেস্ট। দাঁত ব্রাশ করে বাইরে এসে পর্দা সরিয়ে দিতেই শুদ্ধ অবাক হয়ে দেখল পুরো দেয়ালটা কাঁচের, সামনেই সমুদ্র। বড় বড় ঢেউ আসছে একটু পরপর। খুশিতে মনটা নেচে উঠল। তার মানে এটা কোনো বাসা না, এটা হোটেল। তারা কি কক্সবাজারে? দেখে তো কক্সবাজারই মনে হচ্ছে।
শুদ্ধ দৌড়ে বাবার কাছে গেল। দুবার ডাকল, সে উঠল না। বাবা বোধ হয় অনেক দেরি করে ঘুমিয়েছে। তা না হলে এক ডাকেই উঠে যেত। অবশ্য গায়ে হাত দিয়ে ডাকলে উঠবে। দরকার নেই। বাবা একটু ঘুমাক। কিন্তু খিদে পেয়েছে যে! ইন্টারকমের কাছে গিয়ে দেখল ওখানে রুম সার্ভিসের একটা চার্ট আছে। সেখানে রেস্টুরেন্টের নম্বরও আছে। ফোন করে কিছু অর্ডার করতেই পারে। কিন্তু সে তো নিজেদের রুম নম্বরই জানে না। সব হোটেলের দরজার বাইরেই রুম নম্বর থাকে, দেখে এলেই তো হয়। কিন্তু শুদ্ধ কেন জানি দরজাটা খুলতে পারল না। ফিরে এল আবার। ঘুরে ঘুরে এদিক-ওদিক দেখতে লাগল বাবা কোনো খাবার কিনেছে কি না! খাবার না পেলেও মিনি ফ্রিজটা চোখে পড়ল। ফ্রিজটা খুলল, কিছু নেই। একদম ফাঁকা। তারপর অন্যদিকে তাকাতেই দরজা খোলার পাঞ্চ কার্ড দেখতে পেল। এবার বুঝল কেন দরজাটা খুলতে পারে নি। কার্ডে রুম নম্বর দেখতে পেয়ে ফোন করে খাবার অর্ডার করে খেলো।
দুপুর নাগাদ প্রিয়র ঘুম ভাঙল। চোখ মেলে দেখল শুদ্ধ কাঁচের দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখছে। বিছানা থেকে নামতেই এঁটো প্লেট দেখতে পেল। সোজা গিয়ে শুদ্ধকে কোলে নিয়ে বলল, ‘কী রে বাপ আমার, খাবার পেলি কোথায়?
শুদ্ধ একগাল হেসে বলল, ‘রুম সার্ভিসে ফোন করে অর্ডার করেছি।’
‘বাহ! আমার ছেলে দেখছি অনেক স্মার্ট!
হুম, তোমার ছেলে না আমি? মা বলত বাপ কা বেটা, সিপাহি কা ঘোড়া, মনে নেই?
‘খুব আছে। মায়ের বলা কোনো কথাই বাবা ভোলে না।
‘ছেলেও ভোলে না।
প্রিয় হাসল। শুদ্ধও হেসে বলল, ‘আচ্ছা বাবা, আমরা কক্সবাজার কেন এসেছি?
প্রিয় শুদ্ধর মুখটা ধরে গালে ঠোঁট চেপে ধরে চুমু দিয়ে বলল, ‘ঘুরতে।
‘কই, কালকে তো বললে না?
‘সারপ্রাইজ!
‘কিন্তু বাবা, আমার স্কুল?
‘স্কুলে যাওয়া লাগবে না কয় দিন। মাস্তি কর।
‘পরে যেদিন স্কুল যাব, অনেক বকা খাব, বাবা।
‘ওটা আমি ম্যানেজ করব।’
শুদ্ধ বাবার গলা জড়িয়ে ধরল, ‘আমার বাবা পৃথিবীর সেরা বাবা।
‘হয়েছে হয়েছে, বেশি পটাস না।
শুদ্ধ হেসে বলল, আচ্ছা বাবা, নিকিতা মাকে কেন আনি নি আমরা?
‘No women! It’s a men’s tour.’
‘ওয়াও! অনেক মজা হবে বাবা।
·
·
·
চলবে...................................................................................